More

    উচ্চশিক্ষা ও টেকসই উন্নতি

    অধ্যাপক ড. মোহম্মদ তফাজ্জল হোসেন:

    কোন দেশের টেকসই উন্নতি নির্ভর করে ঐদেশের নতুন নতুন টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের উপর। টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্যে প্রয়োজন উচ্চশিক্ষা ও গবেষনার মান বাড়ানো। আর উচ্চশিক্ষা ও গবেষনার তীর্থস্থান হল বিশ্ববিদ্যালয়।

    বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ তিনটি – গবেষণা, শিক্ষাদান,সম্প্রসারণ (Research, Education, Extension)। এই কাজটি যিনি করে থাকেন, তিনি হলেন শিক্ষক।

    শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড আর শিক্ষক হচ্ছেন সেই মেরুদণ্ডের মেরুরজ্জু (স্পাইনাল কর্ড)। আমি বলছিনা শিক্ষকরাই সবচেয়ে মেধাবী, তবে হ্যাঁ এ কথা নিশ্চিত যে, তাঁরা যাদেরকে শিক্ষা দেন, তারা এ জাতির সবচেয়ে মেধাবী। আমার সঠিক পরিসংখ্যান জানা না থাকলেও বলতে পারি যে, যারা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তাদের মাত্র কয়েক পার্সেন্ট (প্রায় ১০%) বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সুযোগ পায় ।

    চরম প্রতিযোগিতার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হবার পর যারা বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে ভালো রেজাল্ট করে, ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট, সেকেন্ড বা থার্ড হয় তাদেরকে আমি অন্যদের থেকে মেধাবী বলছি না।

    কারণ তার অন্য বন্ধুটি হয়তো তার সাবজেক্টটিকে ভালবাসতে পারে নাই বা মনোযোগ দিতে পারে নাই। কাজেই এই ভালো রেজাল্ট ধারী ব্যক্তিটিকে বড়জোর ওই বিষয়ে পারদর্শী (সাবজেক্ট মেটার স্পেশালিস্ট) বিবেচনা করা যেতে পারে।

    একটি টেকসই উন্নত জাতি গঠনের লক্ষ্যে, জ্ঞানের গভীরে প্রবেশ ও গবেষণার জন্যে অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার জন্যে এই সাবজেক্ট স্পেশালিস্টদের খুবই প্রয়োজন। একটি দেশের টেকসই উন্নতির জন্যে গবেষণা অপরিহার্য।

    গবেষক তৈরীর জন্য এই সাবজেক্ট মেটার স্পেশালিষ্ট অত্যাবশকীয়। আমার জানা মতে বর্তমান বিশ্বে গবেষণা খাতে সবচেয়ে বেশি বাজেট রাখে দক্ষিণ কোরিয়া । প্রতিবছর বিশ্বের প্রচুর নামী দামী গবেষকদের আমন্ত্রণ জানায় তাদের দেশে এবং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন টেকনোলজির পেটেন্ট অর্জন করছে।

    ইউরোপ বা আমেরিকার উদাহরণ দেওয়ার দরকার নাই। এশিয়ার কিছু দেশের উদাহারণ দেয়া যেতে পারে । মালয়েশিয়া বিগত কয়েক দশক যাবত, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ হতে উচ্চ বেতন দিয়ে খ্যাতিমান শিক্ষকদের আমন্ত্রণ করে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো ও গবেষণা করার জন্য ।

    ইতিমধ্যে তারা শিক্ষাক্ষেত্রে প্রচুর উন্নতি সাধন করেছে । চীন এর কথা আলাদা করে বলতে হয় । বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দামি পোস্টডক্টরাল ফেলোশিপ প্রদান করে চীন। তারা উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতে এমন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ও পরিবেশ তৈরী করেছে যে, তাদের দেশে যত বিখ্যাত গবেষক, বিজ্ঞানী ও শিক্ষক অন্য দেশে ছিলো তাদেরকে আকর্ষণ করা হয়েছে ।

    তাদের অধিকাংশই দেশের প্রতিষ্ঠানে ফিরে এসেছে । আমাদের সময় এসেছে এরকম পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার । প্রযুক্তি ধার করে বেশি দিন টিকে থাকা যায় না । উন্নত দেশ তৈরী করতে হলে অবশ্যই টেকশই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হবে ।

    প্রয়াত নন্দিত সাহিত্যিক ড. হুমায়ূন আহমেদ দৈনিক প্রথম আলোর এক কলামে লিখেছিলেন, উনি যখন ক্যান্সার চিকিৎসার জন্যে আমেরিকার সবচেয়ে বিখ্যাত হাসপাতালে গিয়েছিলেন, তখন হাসপাতালের পরিচালক এসে বাংলায় ওনাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন।

    তার মানে তিনি একজন বাঙালি। এরকম হাজারো বাঙালি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নামকরা প্রতিষ্ঠানে সম্মানিত অবস্থানে রয়েছেন, যেমন গবেষক, চিকিৎসক, কৃষিবিদ, প্রকৌশলী প্রভৃতি।

    তাদের অন্তর সদা ব্যাকুল থাকে দেশের জন্য কিছু করার, দেশে ফিরে এসে দেশ গড়ার। কিন্তু আমরা তাদের উপযুক্ত পরিবেশ দিতে পারিনা, সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারিনা । দেশের টেকশই উন্নতির জন্য আমাদের মেধাকে কাজে লাগাতে হবে ।

    সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভিন্ন নীতিমালা নামক যে মেনুস্ক্রিপ্ট তৈরি করা হয়েছে, তাতে আসলে সুদূর প্রসারী ও প্রশস্ত কোনো পরিকল্পনা আছে বলে মনে হয় না। বরং মনে হয় যে, এটা কোনো উর্বর মস্তিষ্কের খুবই অগভীর ও সংকীর্ণ চিন্তার ফসল।

    কাজী মোতাহার হোসেন চৌধুরী তার ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধে বলেছেন শিক্ষার দুটি উদ্দেশ্য। একটি ক্ষুদ্র উদ্দেশ্য অপরটি বৃহৎ উদ্দেশ্য। সংক্ষেপে ক্ষুদ্র উদ্দেশ্য হলো আমরা পাশ করে চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করব।

    আর বৃহৎ উদ্দেশ্য হল, আমরা জ্ঞান অর্জন করব, জ্ঞানচর্চা করব। আলোচিত অভিন্ন নীতিমালায়, শিক্ষার শুধু ক্ষুদ্র উদ্দেশ্যই ফুটে উঠেছে। বৃহৎ উদ্দ্যেশ্যের কোন স্থান হয়নি।

    এখানে শিক্ষকতাকে শুধুমাত্র একটা চাকরি হিসেবে দেখা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এটা শুধুমাত্র একটা চাকরি নয়, এটা অনেক দায়িত্বের সমষ্টি।

    উচ্চ শিক্ষা ধ্বংসের আর একটি ভয়ঙ্কর কারণ এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। সবাই বিসিএস নামক সোনার হরিণের পেছনে দৌড়াচ্ছে। কথা ছিল একজন কৃষিবিদ কৃষি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হবে, চিকিৎসক চিকিৎসা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হবে, ইঞ্জিনিয়ার তার বিষয়ে দক্ষ হবে এবং দেশের উন্নয়নে তাদের মেধাকে কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করবে।

    তাদের এই টেকনিক্যাল বিশেষত্ব দিয়েই প্রত্যাশিত চাকরি পাবে। একজন শিক্ষক হিসেবে, আমি আমার ছাত্র-ছাত্রীদেরকে তার বিষয়ভিওিক জ্ঞানের প্রতি আকর্ষন করতে পারছিনা। বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই তাদের সাথে একত্বতা প্রকাশ করছি ।

    যার ফলশ্রুতিতে আমরা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, কৃষিবিদ বা প্রকৌশলী পাচ্ছিনা। আর সঙ্গত কারণেই আমরা বিদেশ নির্ভর হয়ে যাচ্ছি। এটা আমাদের উচ্চ শিক্ষার একটি ভয়ানক খারাপ দিক।

    এক পাগল আরোহীদের সাথে নৌকা করে নদী পার হচ্ছে। নৌকা মাঝ পথে যাওয়ার পর এক যাত্রী পাগল কে বলল এই পাগল তুই আবার নৌকায় ঝাঁকি দিস না। পাগল বলল ভালো কথা মনে করে দিলে তো, এই বলে সে নৌকার ঝাঁকি দিতে শুরু করলো।

    তারমানে তাকে মনে করিয়ে দিয়ে আরো বিপদ হলো। কাজেই নীতিনির্ধারকদের যদি একবার একথা মাথায় ঢুকে যায় যে, টেকনিক্যাল ছাত্ররা কেন অন্য সেক্টরে যাবে। তখন তাদের সাথে আরেকটি বঞ্চনার ঘটনা ঘটবে। যদিও তার সমাধান এটা নয়। তার সমাধান হলো- আমাকে আমার মত থাকতে দাও।

    আমাকে আমার জায়গায় মূল্যায়ন করো, আমাকে মূল্যায়ন করতে না পারলেও অবমূল্যায়ন করো না। যাহোক এভাবে আমাদের বিশেষায়িত জ্ঞান নষ্ট হয়ে গেলে অচিরেই হয়ত তার পরিনতি ভোগ করতে হবে। সবচেয়ে আশংকার জায়গাটি হল, একজন ছাত্র যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন বিষয়ে ভাল রেজাল্ট করল।

    অতপর তার বিশেষায়িত জ্ঞানকে কাজে লাগানোর জন্য তাকে উক্ত বিভাগের শিক্ষক হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হল, যাতে সে আমাদের মেধাবী ছাত্রদেরকে তার জ্ঞান শেয়ার করতে পারে।

    কিন্তু ছাত্রটি দেখা গেল শিক্ষাকতা পেশাটিকে বেছে না নিয়ে, সে তার বিশেষায়িত জ্ঞানকে কাজে না লাগিয়ে চলে গেল কোন ব্যাংক বা ক্যাডার পদে অথবা প্রবাসে। প্রতিনিয়ত বিষয়টি আমরা প্রত্যক্ষ করছি। তার এই জায়গাটি পূরণ হওয়া খুবই কঠিন এবং উচ্চশিক্ষার জন্য এটা একটা অশনি সংকেত ও বটে।

    আমরা সবাই সোনার ডিম পাড়া হাঁসের গল্প জানি। একটা কৃষকের একটা হাঁস ছিলো যেটি প্রতিদিন একটা সোনার ডিম দিত। একদিন কৃষক ভাবল, প্রতিদিন একটা করে ডিম পাওয়ার চেয়ে হাঁসের পেট কেটে একসাথে সবগুলো ডিম বের করে নিলেইতো হয়। তাই সে সত্যিসত্যি হাঁসের পেট কাটল। হাঁসের পেটে কোনো ডিম পেল না এবং হাঁসটি মারা গেল।

    উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন যে অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে তা বাস্তবায়িত হলে উচ্চশিক্ষার পরিণতি সোনার ডিমপাড়া হাঁসের মতো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ এই সেক্টরে ভাল কেউ আসতে চাইবে না।

    এই নীতিমালা শুধুমাত্র শিক্ষকদের প্রমোশন বা আপগ্রেডেশনকে বিলম্বিত করতে দেখানো হয়েছে। সঠিক হলো, বিলম্বিত ও ত্বরান্বিত দুইটাই থাকতে হবে।

    অর্থাৎ বাধা ও অনুপ্রেরণা দুইটাই থাকতে হবে। মূল্যায়ন করতে হবে বৈজ্ঞানিক গবেষনা প্রবন্ধ প্রকাশ (ইমপেক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে) ও ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে।

    ইমপেক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে প্রকাশ করলেই তার বেতন বৃদ্ধি পাবে বা ইনক্রিমেন্ট যুক্ত হবে, অন্যথায় নয়। যে ব্যবস্থা দক্ষিণ কোরিয়ায় চালু আছে। এটা হলে গবেষকরা সারাদিন গবেষণাগারের পড়ে থাকবে। আর ক্লাসের পারফরমেন্স ছাত্র-ছাত্রীদের মাধ্যমে মূল্যায়ন করবে।

    বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত এক দশকে দেশে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এই সময়ে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় তিনগুণ।

    ইতোমধ্যে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি। আমাদের পরবর্তী ভিশন-২০৪১, এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে।

    ভিশন-২০৪১ কে বাস্তবায়ন ও ফলপ্রসূ করতে হলে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতকে ঢেলে সাজাতে হবে এবং উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠন করতে হবে ।

    লেখকঃ অধ্যাপক, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

    © এই নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
    / month
    placeholder text

    সর্বশেষ

    রাজনীাত

    বিএনপি চেয়ারপারসনের জন্য বিদেশে হাসপাতাল খোজা হচ্ছে

    প্রভাতী সংবাদ ডেস্ক: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্যে আবেদন করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা মনে করেন আবেদনে সরকারের দিক থেকে ইতিবাচক...

    আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ

    আরো পড়ুন

    Leave a reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    spot_imgspot_img