More

    এক্সেপ্ট ইসরায়েল বিতর্ক: ফিলিস্তিনি প্রতিক্রিয়া ও বৈশ্বিক রাজনীতি

    সম্রাট দেব চৌধুরী

    বাংলাদেশী ই পাসপোর্টে “এক্সেপ্ট ইসরায়েল” শব্দ দুটি বাদ দেওয়ার একটা সংবাদ তিন দিন আগে প্রকাশ হয়।

    এই সংবাদের প্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয় ইসরায়েলের ব্যাপারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বদলেনি, এবং এ দুটি শব্দ বাদ দেওয়া হয়েছে কেবল বাংলাদেশী পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক মান বাড়াতে।

    এ সংবাদের প্রেক্ষিতে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত কোনো ধরনের কূটনৈতিক শিষ্টাচারের তোয়াক্কা না করেই চপল ধরনের কিছু মন্তব্য করেছেন। তিনি এও বলেছেন যে “বাংলাদেশের এ ধরনের কাজ একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।” আমার মনে হয়, দম্ভ সহকারে এ কথা বলার মতো অবস্থানে ফিলিস্তিন বা ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে তিনি নিজে রয়েছেন কিনা তা তার ভেবে দেখা উচিৎ ছিলো।

    কূটনৈতিক শিষ্টাচারের একটা ব্যাপার থাকে। এসব ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা না বলে সরাসরি সংশ্লিষ্ট দেশের গণমাধ্যমের কাছে বক্তব্য দেওয়াটা অত্যন্ত অপেশাদার আচরণ।

    আমার পক্ষে তাঁর সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ করা সম্ভব হলে আমি তাঁকে এও স্মরণ করিয়ে দিতাম যে “শোষিত দেশের পাশে থাকার যে আহ্বান তিনি বাংলাদেশকে করছেন বা যা তাঁর আহ্বানেরও বহু বছর পূর্ব থেকেই বাংলাদেশ করে আসছে, সেই সংহতি বাংলাদেশ তার মুক্তির সংগ্রামের সময়ে ফিলিস্তিনের কাছে পায়নি৷ বরং ফিলিস্তিনের গ্র‍্যান্ড মুফতি বারোই ডিসেম্বর, উনিশশো একাত্তর সালে মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন “পাকিস্তানকে সকল প্রকার বস্তুগত ও নৈতিক সমর্থন যেনো দেওয়া হয়।”

    ফিলিস্তিনের পাসপোর্ট

    বাংলাদেশ “এক্সেপ্ট ইসরায়েল” শব্দযূথ সরিয়ে নিয়ে ঠিক করেছে না ভুল করেছে তা নিয়ে আমি তর্কে যাবো না, শুধু যে রাষ্ট্রদূত এতো গালভরা সমালোচনা করলেন তার নিজের দেশের পাসপোর্টের সংশ্লিষ্ট পাতার ছবিটাই তুলে দিলাম।

    একাত্তরে ফিলিস্তিনের গ্রান্ড মুফতি’র বিবৃতি

    তারা নিজেরাই ইসরায়েল ভ্রমণে কোনো প্রকার নিষেধাজ্ঞা রাখেননি। শুধু তাই নয়, ইসরায়েলি প্রচুর কড়াকড়ি সত্ত্বেও ফিলিস্তিন থেকে ইসরায়েলে ভ্রমণ করা যায় এবং তারা তা করেনও।

    আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ফিলিস্তিনের পক্ষে সমর্থন দেখানোর লক্ষ্যে পুনরায় “এক্সেপ্ট ইসরায়েল” শব্দ দুটি যোগ করতে বলা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত তার নিজের দেশের ইসরায়েল বিষয়ক পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে কী বলবেন?

    আমি কদিন আগে দেখলাম তুরষ্কের এরদোয়ান সাহেব নানান হম্বিতম্বি করলেন ইসরায়েল প্রসঙ্গে। তিনি জাতিসংঘের তীব্র সমালোচনা করলেন এবং প্রয়োজনে মুসলিম জাতিসংঘ গড়ার ঘোষণাও দিলেন।

    কিন্তু এরদোয়ান সাহেব একবারও এই প্রসঙ্গটি তুললেন না বা তুলবেন না যে মুসলিম দেশগুলোর মাঝে প্রথম দেশ হিসেবে তুরষ্কই ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছিলো আর এরদোয়ান এতোদিন ধরে ক্ষমতায় থেকেও সেই স্বীকৃতি প্রত্যাহার করেননি বা ইসরায়েলের সাথে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। উপরন্তু ইসরায়েলের সাথে অন্যতম বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা দেশগুলোর একটি তুরষ্কই, যে প্রসঙ্গে এরদোয়ান নিজেই একবার বলেছিলেন “তুরষ্কের জন্য ইসরায়েলকে প্রয়োজন”।
    আমি এতো কথা বলার মূল কারণ এটিই যে আমরা নিজের দেশের যতোই সমালোচনা করি না কেনো বা দূর্নীতির নানা সূচকে যতোই প্লেস পাই না কেনো, দিনশেষে আমার মনে হয় আমরা অত্যন্ত সৎ ও নীতিবোধসম্পন্ন একটি জাতি।

    কারণ আমরা যখন বলি শোষক দেশ ইসরায়েলের সাথে আমরা কোনো সম্পর্ক রাখবো না তখন আমরা আসলেই কোনো সম্পর্ক রাখি না। অথচ রাখতে চাইলে আমাদের কোনো বাধা ছিলো না। এমনকি ধর্মীয় রাজনীতির দিকটি দেখলেও। কারণ যখন ইসলামিক রিপাবলিক অভ পাকিস্তান আমাদের ওপর ভয়াবহ গণহত্যা ও গণধর্ষণ চালিয়েছিলো তখন মুসলিম বিশ্বের কোনো প্রকার প্রত্যক্ষ সহায়তা কিন্তু আমরা পাইনি। বরং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চেয়েছিলো এই ইসরায়েলই।*

    সুতরাং বাংলাদেশ যদি ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক গড়তো তাহলে আজ বাংলাদেশের সে জন্যে কিন্তু কোনো জবাবদিহি কারো কাছে করতেও হতো না আর বাংলাদেশের কিছু আসতো যেতোও না।
    অথচ বাস্তবে কিন্তু বাংলাদেশ করলো তার উল্টোটা।

    যে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর আগপর্যন্ত সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলো না, তৎকালীন বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক ব্লকের অন্যতম নেতা সেই বঙ্গবন্ধুই কিন্তু শোষক দেশ হওয়ায় ইসরায়েলকে নির্দ্বিধায় প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

    অর্থাৎ সারাবিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলো যত যাই করুক না কেনো, ছোট্ট দেশ বাংলাদেশ ঠিকই নৈতিকতার জায়গায় একটা চুলও ছাড় দেয়নি। তখনও দেয়নি, আজও দেয় না।

    এমন আরেকটি উদাহরণ আমি দিবো সামরিক বাহিনী প্রসঙ্গে। বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে শুরু করে ইউনিপোলার বিশ্বের প্রধান ক্ষমতাধর আমেরিকা, সৌদী আরব থেকে রাশিয়া, চীন বা ইরান; সবাই যখন নিজ নিজ সেনাবাহিনী নিয়ে নানা দেশের সাথে বা নিজ অভ্যন্তরেই বিবিধ সমরে লিপ্ত, বাংলাদেশের মতো ছোট্ট দেশটি কিন্তু তখন বৈশ্বিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সবচেয়ে বেশি সেনা মোতায়েন করে চলেছে প্রতি বছর।

    সামরিক বাহিনী, যা হওয়ার কথা ছিলো শান্তি রক্ষার উপাদান; তাকেই যখন মোড়ল দেশেরা দখলদারিত্বে ব্যবহার করে চলেছে তখন ছোট্ট দেশ বাংলাদেশই শান্তি রক্ষার থ্যাঙ্কলেস জব পালন করে চলেছে নিঃশব্দে ও নিরহঙ্কার ভাবে।
    এই যে এতো কিছু লিখলাম তার কারণ একটাই।

    এই যে এতো দেশের কথা বললাম, এই যে ফিলিস্তিনের কথাই বললাম; এই ফিলিস্তিনও নিজের ফায়দা বুঝে। নীতি নৈতিকতার গালভরা আলাপ মুখে মুখে দেওয়ার পাশাপাশি সম্পূর্ণ ১৮০ ডিগ্রী বিপরীত কার্যক্রম করে,করেই চলে। তুরষ্ক করে। করে আমেরিকা, ভারত।
    অথচ আমাদের দেশের একটা বড় জনগোষ্ঠীকে আমি দেখি নিজ নিজ রাজনৈতিক তীর্থক্ষেত্র ওসব দেশকেই মানতে।

    কোনো গোষ্ঠী “তুরষ্কের নেতাই আমাদের খলিফা” বলে হুঙ্কার ছাড়েন তো কেউ বা “নিপীড়তের কন্ঠস্বরই আমার কন্ঠস্বর” বলে গর্জে ওঠেন। কেউ বা পাল তোলেন আমেরিকার তীর বরাবর, কারো বা ঘোড়া ছুটে রাশিয়া লক্ষ্য করে।

    এদের কেউই বাংলাদেশ ও বাঙালী নীতিবোধে সন্তুষ্ট নন। এদের কারোরই বাঙালী সিদ্ধান্তপদ্ধতি ও কর্মধারার প্রতি নেই আগ্রহ বা আকাঙ্ক্ষা।
    কেউ হতে চান এরদোয়ানের সেনানী, কেউ গড়তে চান আরেক টুকরো আফগানিস্তান, কারো বা আবার পুতিনের কমরেড হওয়ার দূরন্ত ইচ্ছা মনের গন্ডী পেরিয়ে শাহবাগ পর্যন্ত ঝড় তুলে মিইয়ে যায়।

    অথচ আমি দেখতে পাই এই নানা শঠতা আর ছলনায় ভরা বিশ্ব রাজনীতিতে খুব ধীরে কিন্তু খুব দৃঢ়ভাবে একটি দেশ কিন্তু খুবই অল্প অল্প করে নিজস্ব একটি স্বকীয় অবস্থান গড়ে তুলছে।

    দেশটি ক্ষুধার্ত, বিদ্রোহ বিপ্লবে বিহ্বল আফ্রিকায় গড়ে তোলে কৃষি বিপ্লব, যার প্রতিদানে সেই কালো মানিকেরা তাদের সেই কৃষিপদ্ধতির নামকরণ করেন দেশটির নামে।

    দেশটি যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের শিশুদের হাতে বই খাতা তুলে দিয়েই ক্ষান্ত হয় না, ভীম রণভূমের অনতিদূরেই খুলে বসে পাঠশালা। যার প্রতিদানে তাদের ভাষাই হয়ে যায় সেই উপদ্রুত অঞ্চলের আনুষ্ঠানিক দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা।

    দেশটি নিজের আঠারো কোটি উদরের চাহিদা পূরণের পরেও আরো আঠারো লক্ষ শরণার্থীকে হাসিমুখে বরণ করে। পরম ভালোবাসায় শুধু আশ্রয়ই দেয় না, তাদের নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ্য আবাসনের জন্যে আস্ত একটা দ্বীপকে গড়ে তোলে নাগরিক সুবিধায় পরিপূর্ণ করে।

    দেশটির নাম বাংলাদেশ। বিশ্বের প্রতিটি নিপীড়িত, অবহেলিত দেশ ও জনগোষ্ঠীর ইতিহাসে যে দেশ নিজের অতীতকে দেখতে পায়। পরম মমতা ও দৃঢ় সাহস নিয়ে যে দেশ সবহারাদের পাশে সবার আগে ছুটে যায়।

    বাংলাদেশের এই নীতি বাংলাদেশকে অনন্য একটি অবস্থান বিশ্বে ইতোমধ্যে দিয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বিবাদ নয়”। বিবাদ বাংলাদেশ কারো সাথেই করেনি, কিন্তু বিশ্বের তথাকথিত “ছোট” এবং “তৃতীয় সারির” দেশগুলোর একটু বেশিই বন্ধু হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ।

    বিশ্ব রাজনীতির শতাব্দীপ্রাচীন প্লট যখন পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে ঠিক সে সময়ে বাংলাদেশের এই ধীর কিন্তু অবিরত ভাবে বর্ধমান স্বকীয়তা বাংলাদেশের জন্যে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

    নৈরাশ্যবাদীরা যখন বাংলাদেশের শত ছিদ্র অন্বেষণে ব্যস্ত তখন আমি বরং এই বাংলাদেশের মাঝেই দেখতে পাই “নিপীড়িত বিশ্বের” নেতৃত্ব দিতে পারার মতো, বিশ্বের সব নিপীড়িত মানুষের কন্ঠস্বর ও সেতুবন্ধন হয়ে ওঠার মতো অদম্য এক শক্তিকে।

    আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ পারবেই। শুধু আমাদের নিজেদের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে। নিজেদের রাজনৈতিক তীর্থক্ষেত্র অন্য দেশকে বানানো বন্ধ করতে হবে। অন্য দেশে নিজেদের নেতা খোঁজা বন্ধ করতে হবে।

    এক হতে হবে বাঙালি জাতীয়তাবাদে।
    তবেই বাংলাদেশ পারবে। বাংলাদেশ পারবেই!

    • ইসরায়েল ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসেই বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিতে চেয়েছিলো৷ তৎকালীন মুজিবনগর সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে তারা পুনরায় স্বীকৃতি দানের প্রস্তাব দিলে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু সে প্রস্তাব পুনরায় প্রত্যাখ্যান করেন।

    বি. দ্র: মুক্তমত কলামে লেখার দায় শুধুমাত্র লেখকের। প্রভাতী সংবাদ কর্তৃপক্ষ লেখার দায় বহন করবে না।

    © এই নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
    / month
    placeholder text

    সর্বশেষ

    রাজনীাত

    বিএনপি চেয়ারপারসনের জন্য বিদেশে হাসপাতাল খোজা হচ্ছে

    প্রভাতী সংবাদ ডেস্ক: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্যে আবেদন করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা মনে করেন আবেদনে সরকারের দিক থেকে ইতিবাচক...

    আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ

    আরো পড়ুন

    1 Comment

    Leave a reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    spot_imgspot_img