More

    বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর ভাষন ও সমাজ বিপ্লবের রুপরেখা

    সাইফুল আলম বাপ্পি:

    ০১. ১৯ জুন, ১৯৭৫। বঙ্গভবন,  ঢাকা। বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামিলীগ -বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম  বৈঠক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে নীতিনির্ধারণী ভাষনটি দিয়েছিলেন, সেটা ছিলো এক ঐতিহাসিক দলিল। ভাষনটি লিখিত ছিলোনা। এটা ছিলো সম্পূর্ণ মৌখিক ভাষন।

    এই ভাষনটিতে ছিলো বাকশাল গঠনের কারন এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা। তিনি সহজ সরল ভাষায় সমাজ বিপ্লবের এক অসাধারণ বিশ্লেষণ করেছিলেন। তাত্ত্বিকভাবে জটিলতা বর্জিত কিন্তু প্রায়োগিক দিক থেকে সহজ ও কার্যকর একটি বিপ্লবের ডাক তিনি এই ভাষনের মাধ্যমে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বহু কালজয়ী ভাষনের মধ্যে এই ভাষনটিকে অন্যতম সেরা ভাষন বলা যায়।

    বঙ্গবন্ধু বাকশালকে দেশের সকল শ্রেনী পেশার মানুষের সমন্বয়ে একটি সামগ্রিক প্লাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। রাজনীতিবিদ, আমলা, কৃষক, শ্রমিক, ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার, শিক্ষকসহ সকল শ্রেনী

    পেশার মানুষদের সমন্বয়ে এমন এক চলমান প্রক্রিয়া তিনি শুরু করার ঘোষনা দিয়েচিলেন, যা নির্দিষ্ট এজেন্ডা নির্ধারণ করবে এবং প্রতিটি এজেন্ডার নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে গৃহিত কর্মসূচী বাস্তবায়ন হবে।

    বঙ্গবন্ধু বলেন,

    “… আগস্ট মাসে সেন্ট্রাল কমিটির বৈঠক বসবে। একদিন দুদিনের জন্য নয়, দরকার হলে পাঁচ-সাত দিনের জন্য বসবে।এবং সেই সেন্ট্রাল কমিটির মিটিংয়ে বিভিন্ন এজেন্ডা দেয়া হবে। সেই এজেন্ডা অনুযায়ী কনফারেন্সকে ভাগ করে কতোগুলো সাব-কমিটি বা কমিশন করে দেয়া হবে। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট এবং বাইরের যদি দরকার হয় তাদের নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করে একটা প্রপোজাল সাবমিট করা হবে কনফারেন্সের কাছে। যেমন ফুড, এগ্রিকালচার, ইন্ডাস্ট্রি, ফ্লাড কনট্রোল, এডুকেশন বিভিন্ন সাবজেক্টের সাব-কমিটি করে তাদের কাছে ভার দেয়া হবে। রেসপেক্টিভ মিনিস্টার সেখানে থাকবেন। সরকারি কর্মচারীরা থাকবেন। দরকার হয় বাইরে থেকে- যারা আমাদের কমিটি মেম্বার নয়, কিন্তু যারা কন্ট্রিবিউট করতে পারেন, তাদেরকে আমরা ইনভাইট করতে পারব। সেখানে বসে কতটুকু কি করা হয়েছে, কতটা ভুল হয়েছে, কি ত্রুটি হয়েছে বা কী কী করলে আমরা দেশের ইমপ্রুভমেন্ট করতে পারব।সাজেশন দিলে তখন সেন্ট্রাল কমিটি থেকে এটা প্রস্তাব করে গভর্নমেন্ট সেই অনুযায়ী তাদের কাজকর্ম করবে। এই আমাদের ইচ্ছে। আগস্ট মাসে একটা ফুল এজেন্ডা নিয়ে কাজ শুরু করা।”

    সবাইকে ইনভলভ করে তিনি নির্দিষ্ট প্রস্তাবনার ভিত্তিতে কাজ করার উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

    ০২. বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষনে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে একটা সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা এবং রাজনৈতিক বিষয়েও আলোচনা করেন। বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনের ভিতর দূর্নীতির মহাযজ্ঞ চলছিলো, বঙ্গবন্ধু তা অকপটে স্বীকার করেন। একই সাথে তিনি রাজনীতির নামে চলমান লুটপাট খুনখারাবি’র বর্ণনা করেন।

    তাঁর বর্ণনায় উঠে আসে কিছু চরম সত্য-

    “…আজ দুনিয়ার দিকে আমাদের চাইতে হবে। স্বাধীনতার পর আমাদের কী দশা হলো? ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আমরা স্বাধীনতা পেলাম, এবং রক্তের বিনিময়ে পেলাম। সাড়ে সাত কোটি লোক, ৫৪ হাজার স্কয়ার মাইল। সম্পদ বলতে কোনো পদার্থ আমাদের ছিল না। সমস্ত কিছু ধ্বংস, আমরা কিন্তু চেষ্টা করলাম যে ঠিক আছে, আমরা একদম যাকে যা ফ্রীহ্যান্ড দিয়ে দিলাম। আচ্ছা বলো, আচ্ছা করো, আচ্ছা দল গড়ো, আচ্ছা লেখো, আচ্ছা বক্তৃতা করো, বাধা নেই, ফ্রি হ্যান্ড। আমার মনে নেই,  বোধ হয়, আমার মনে পড়ে না যে দশ বিশ বছরের মধ্যে আমরা অনেক পুরানা নেতৃবৃন্দ আছেন যে পল্টনে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে গালাগালি করে কেউ ফিরে গেছে। এ আমার জানা নেই বিশ পঁচিশ বছরের মধ্যে। কিন্তু তাও ক্ষমতায় এসে বিপ্লবের মাধ্যমে বললাম, যদি কিছু ভালো কথা বলতে চাও বলো, যদি দেশের মঙ্গল হয় বলো। কিন্তু দেখতে পেলাম কি? আমরা যখন এই পন্থায় এগুতে শুরু করলাম, বিদেশি চক্র এদেশে মাথা চাড়া দিয়ে উঠল এবং তারা এদেশের স্বাধীনতা বানচাল করার জন্য ষড়যন্ত্র শুরু করল এবং ফ্রি স্টাইল শুরু হয়ে গেল। হুড়হুড় করে বাংলাদেশে অর্থ আসতে আরম্ভ করল।দেশের মধ্যে ধ্বংস – একটা ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ যা- এছাড়াও আরও দেখা গেল, যাদের আমরা এ সমস্ত ভোগ করতে দিলাম তারা রাতের অন্ধকারে মানুষ হত্যা আরম্ভ করল।

    ….. এত অস্ত্র উদ্ধার করি তবু অস্ত্র শেষ হয় না। এই রাজনীতির নামে হাইজ্যাক, এই রাজনীতির নামে ডাকাতি, টেলিফোন করে মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায় করে বা মানুষের বাড়িতে গিয়ে গহনা কেড়ে নেয়। রাজনীতির নামে একটা ফ্রি-স্টাইল শুরু হয়ে গেল।

    …. সাড়ে সাত কোটি লোক, ২০০ বছরের গোলামি, অর্থনৈতিক কাঠামো নেই। সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট বলে কোন গভর্নমেন্ট নেই, সবকিছু রয়েছে ইসলামাবাদে। একটা প্রভিনশিয়াল গভর্নমেন্ট ছিল, ছোটোখাট, তাও নয় মাসে আর্মি কন্ট্রোলে নিয়ে নিল। তাদের স্ট্রাকচার ধ্বংস করে দিল। নেই একটা পরেন অফিস, নেই একটা প্ল্যানিং অফিস, নেই একটা কোনো কিছু। আমাদের সবকিছু আরম্ভ করতে হয়েছিল গোড়া থেকে।”

    বঙ্গবন্ধু দেশের পুরো পরিস্থিতির বর্ণনা করেছিলেন তাঁর ভাষনে। এবং কেন নতুন সিস্টেম করা জরুরী হয়ে গেলো সেটাও বোঝালেন।

    ০৩. একটি সদ্য স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কি ভুমিকা থাকবে, বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষনে সেটাও দারুন ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। বাংলাদেশ নির্দিষ্ট কোনো জোটের অন্তর্ভুক্ত থাকবেনা। বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতিতে নিজেদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখবে। তিনি দুনিয়ার সকল শোষিত মানুষের পক্ষেই বাংলাদেশের সমর্থন প্রকাশ করলেন। এর সাথে তিনি প্রতিবেশী দেশসমূহের সাথেও সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কে বিশ্বাস রাখেন বলে ঘোষণা দিলেন।

    বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে বঙ্গবন্ধু ভাষনে বললেন-

    ” আমরা নন এলায়েন্ড, আমরা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফরেন পলিসিতে বিশ্বাস করি, আমরা পিসফুল কো-এক্সিসটেন্স-এ বিশ্বাস করি। আমরা দুনিয়ার নির্যাতিত পিপলের সাথে আছি, আমরা কারো সাথে শত্রুতা করতে চাইনা। আমরা সকলের সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই, আমরা আন্ডার ডেভেলপড কান্ট্রি, আমরা বিশ্বে শান্তি চাই, আমাদের লোক বাঁচতে চায়। এই পলিসি সকলেই – প্রায় হোল ওয়ার্ল্ড – পছন্দ করল। আমার দেশবাসী সেটাকে সমর্থন জানাল।…..  আমরা সকলের সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই। ইন্টারন্যাশনাল পকিটিক্স-এ আমাদের প্রয়োজন নাই, এতে আমাদের কোনো স্বার্থ নেই। আমরা, যেখানে কোনো অপ্রেসড ইন্টারন্যাশনাল পিপলস থাকবে, তাদের মর‍্যাল সমর্থন দিতে পারি, এবং দিব, যেখানেই থাকুন না কেন, আমরা দিব। আমরাও অপ্রেসড পিপল, আমরাও যুগযুগ ধরে এটার সঙ্গে পরিচিত ছিলাম, আমরাও মার খেয়েছি, দুনিয়ার শোষকগোষ্ঠী, ইম্পেরিয়ালিস্ট পাওয়ার আমাদের সম্পদ লুট করে নিয়েছে। আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, আমাদের স্বজন হারানোর অর্থ কি? এর অর্থ হলো আমাদের অর্থনীতির মালিক আমি এবং আমার দেশ সেই সম্পদ ভোগ করবে।”

    ০৪. বাকশাল গঠনের প্রয়োজনীয়তা, একটা ‘জাতীয় দল’ গঠন করে নতুন একটা সিস্টেমেরই কেন প্রয়োজন হলো সেগুলো বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষনে বর্ননা করলেন। তিনি গোটা প্রশাসনের মূল কাঠামোতে আমূল-পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন। ব্রিটিশ পাকিস্তানি আমলাতান্ত্রিক সিস্টেমকে সম্পূর্ণ ভেঙ্গে ফেলতে চেয়েছিলেন। তিনিই তার ভাষনে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ঘোষণা দিয়ে সকল মহাকূমাগুলোকে জেলায় রুপান্তরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এভাবে তিনি রাজনীতিবিদ, কৃষক, শ্রমিকসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে সকল কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

    বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষনে বলেন,

    “…. কাল আমি অর্ডার দিয়ে এসেছি। গো অন, সিক্সটি ডিস্ট্রিকটস। ষাইটটি সাবডিভিশন ষাইটটি জেলা। প্রত্যেক জেলার জন্য একজন গভর্নর থাকবেন। কাউন্সিলে সরকারি কর্মচারীরাও থাকবেন। প্রত্যেক জেলায় অর্থাৎ বর্তমান মতাকুমাসমূহে একটি করে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাউন্সিল থাকবে এবং তার একজন গভর্নর থাকবে। সে স্থানীয়ভাবে শাসনব্যবস্থা চালাবে। শাসনব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে। জেলা গভর্নরের কাছে যাবে আমার ওয়ার্কস প্রোগ্রামের টাকা। তার কাছে যাবে আমার খাদ্য সামগ্রী। তার কাছে যাবে আমার টেস্টরিলিফ, লোন, বিল ও সেচ প্রকল্পের টাকা। কেন্দ্রীয় প্রশাসনের ডাইরেক্ট কন্ট্রোলে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাউন্সিল ডিস্ট্রিক্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন পরিচালনা করবে। তবে ব্রিটিশ আমলারা বলে গিয়েছেন,সাবডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট থাকতে হবে, এসডিও সাহেব, যা করবেন সেটাই হবে ফাইনাল কথা। সিও সাহেব শাসন করবেন থানায় বসে, সেই অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রাখতে হবে? এতে দেশের মঙ্গল দুরের কথা।……  আমি বলেছি কাজ করে যান যা কিছু দরকার হয়। এই অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, তারপর আমাদের সেক্রেটারিয়েট ভাঙতে হবে। এসব চলতে পারে না। আই অ্যাম গোয়িং ফর দ্যাট। টাকা নাই, পয়সা নাই, খাবার নাই, এটা নাই ওটা নাই। ভাঙতে হবে। ডাবল, ট্রিপল অ্যান্ড দ্যাট।..”

    ০৫. বঙ্গবন্ধুর এই ভাষন ছিলো দূর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। তিনি দেশের জনগনকে দূর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করে কর্মসূচী দিয়েছিলেন। রাজনীতির ময়দানে তিনি সৎ ও দৃঢ়চেতা মানুষদের অন্তর্ভুক্তওর উপর জোড় দিয়েছিলেন। দূর্নীতির মূলোৎপাটন করতে তিনি সম্পূর্ণ প্রশাসনিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনেরও ঘোষণা দিয়েছিলেন।

    তাঁর ভাষায়-

    “….আমি একটা হাই অফিসিয়াল, আমি একটা পলিটিশিয়ান, আমি একটা পলিটিকাল ওয়ার্কার, আমি একটা এমপি, আমি দেশের একজন কর্মচারী, আমি একজন পুলিশ অফিসার। আই হ্যাভ মাই রেসপনসিবলিটি। এখানে চুরি হচ্ছে, এখানে অন্যায় হচ্ছে, এখানে খারাপ হচ্ছে – এটা বলার অধিকার আমার থাকবে। দেখার অধিকার থাকবে। সেই জন্য আজকে যদি পলিটিক্যাল অরগানাইজেশন স্ট্রং না করা হয়- ভিলেজ লেভেল থেকে আরম্ভ করে শেষ পর্যন্ত যাকে ওয়াচ ডগ বলা হয়- তাহলে দেশের মঙ্গল করা যায় না শুধু সরকারি কর্মচারীর উপর নির্ভর করে। দেয়ার মাস্ট বি এ ব্যালেন্স। দেয়ার মাস্ট বি পিপল মোবিলাইজেশন। হোল কান্ট্রিকে, সমস্ত দেশকে মবিলাইজ করতে হবে ফর ডেফিনিট পারপাজ।….  পাবলিক অপিনিয়ন মবিলাইজ না করলে শুধু আইন দিয়ে করাপশন বন্ধ করা যাবে না এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে সিস্টেমকে পরিবর্তন করতে হবে। ঘুনে ধরা সিস্টেম দিয়ে করাপশন বন্ধ করা যায় না। এই সিস্টেমেই করাপশনের পয়দা। এই সিস্টেম করাপশন পয়দা করে এবং করাপশন চলে।

    সেই জন্য আমার দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক। ভেঙে ফেলে সব নতুন করে গড়তে হবে। নিউ সিস্টেম করতে হবে।”

    ০৬. বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষনের মাধ্যমে পরিস্কার করেছিলেন, বাকশাল কোনো একদলীয় শাসনব্যবস্থা নয়, বরং একটা সমবায় ভিত্তিক সমাজ কাঠামো গড়ে তোলার সূচনা। তিনি সমবায় বা কো-অপারেটিভের মাধ্যমে সকল মানুষকে তাঁর দ্বিতীয় বিপ্লবে শামিল করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে সমবায় ব্যবস্থার পরিকল্পনা করেছিলেন কৃষকের, শ্রমিকের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে। দেশের একটা যৌথ সমাজ গড়ে তুলে শোষনহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। এমনকি তিনি কৃষক শ্রমিকের পৃথক সংগঠন করারও ঘোষণা দিয়েছিলেন।

    বঙ্গবন্ধু কো-অপারেটিভ বিষয়ে বলেন,

    ” আজকে কো-অপারেটিভ যদি আমরা করতে পারি, সেখানে যদি ফার্টিলাইজার দিতে পারি, রেশন কার্ডে দিতে পারি, তাহলে সেখানে চুরি কম হবে। সেখানে যদি ওয়ার্কস প্রোগ্রামের টাকা দিতে পারি-চুরিটা কম হবে। একটা সিস্টেমের মধ্যে আসতে পারি। চিৎকার করে, গালাগালি করে কাজ হবেনা। “

    ০৭. বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষনে সুনির্দিষ্ট করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির আদলে নতুন একটা প্রগতিশীল শোষনহীন অর্থনৈতিক কাঠামোর কথা বলেছেন। তিনি এটাও স্পষ্ট করেছেন কোনো তত্ত্বকে কপি করে এদেশের অর্থনীতি চলবেনা। বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থার উপযোগী সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির মূলমন্ত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব একটি অর্থনীতি গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছিলেন।

    বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রসংগে তিনি বলেছেন,

    “…  তবে এখানে যে শোষনহীন সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কথা আমরা বলেছি সে অর্থনীতি আমাদের, সে ব্যবস্থা আমাদের, কোনো জায়গা থেকে হায়ার করে এনে, ইম্পোর্ট করে এনে, কোন ইজম চলেনা, এদেশে-কোনো দেশে চলে না। আমার মাটির সঙ্গে, আমার মানুষের সঙ্গে, আমার কালচারের সঙ্গে, আমার ব্যাকগ্রাউন্ডের সঙ্গে, আমার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করেই আমার ইকোনোমিক সিস্টেম গড়তে হবে। কারন আমার দেশে অনেক অসুবিধে আছে। কারন আমার মাটি কী, আমার পানি কত, আমার এখানে মানুষের কালচার কী, আমার ব্যাকগ্রাউন্ড কী, তা হয় না। ফান্ডামেন্টালি আমরা একটা শোষনহীন সমাজ গড়তে চাই। আমরা একটা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি করতে চাই। বাট সিস্টেম ইজ আওয়ার্স। উই ডু নট লাইক টু ইমপোর্ট ইট ফ্রম অ্যানিহোয়্যার ইন দি ওয়ার্ল্ড। এটা আমার মতো, পাটির মতো।”

    ০৮. বঙ্গবন্ধুর কুটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয়ও পাওয়া যায় তাঁর ভাষনে। কুটনৈতিক শিষ্টাচার চর্চার বিষয়ে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের টেকনিকালি বার্তা প্রদাণ করেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সমর্থন এবং স্বীকৃতি প্রদানের কথাও আলোচনা করেন এবং এটা বাংলাদেশের কর্তব্য বলে ঘোষণা করেন।

    তিনি বলেন,

    ” আমরা কারোর বিরুদ্ধে কোনো কিছু বলতে চাই না। আমাদের একটা ফ্যাশান হয়ে গেছে যে, এ ওর বিরুদ্ধে গালাগালি করে, অন্য একজনের বিরুদ্ধে গালাগালি করে। বাংলাদেশের মাটিতে যেন একটা হটবেড অব ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্স হয়ে গেছে। এ ওরে গালাগালি করে, ও ওরে গালাগালি করে, আমার মাটিতে বসে গালাগালি দরকার কি বাবা। যার যার দেশে গিয়ে গালাগালি করো। একটা ডিপ্লোমেটিক ডেকোরাম আছে। এক দেশে দাঁড়িয়ে অন্যদেশের বিরুদ্ধে কথা বলা চলে না। আমার দেশে তোমার কি ভালো, সেটা বলো।”

    ০৯. বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষনে দূর্নীতির বিরুদ্ধে অলআউট লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক কর্মী, সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং জনগন সকলকে একসাথে দূর্নীতির বিরুদ্ধে নতুন বিপ্লবে শামিল হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। দূর্নীতিবাজদের সোশ্যালি বয়কট করার আহবান জানিয়েছিলেন। তাঁর প্রতি মানুষের অগাধ ভালোবাসার প্রতিদান তিনি দূর্নীতির মূলোৎপাটন করে দিতে চেয়েছিলেন।

    বঙ্গবন্ধু দূর্নীতির বিরুদ্ধে উচ্চারণ করেন,

    “…. আজকে সকলে মিলে, যার যার যা কর্তব্য আচে, সেই সঙ্গে করাপশনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। সারা বাংলাদেশের টুয়েনটি থেকে থার্টি পার্সেন্ট দুঃখ দূর হয়ে যাবে যদি করাপশন বন্ধ করতে পারি। থার্টি পার্সেন্ট দুঃখ দূর হয়ে যাবে মানুষের। এজন্য লেট আস টেক ওথ টুডে। যে নিজেরা বমরা করাপট প্র্যাকটিস করি, তাই আবার অন্য কেউ করলে আমরা সহ্য করি না। উই মাস্ট মবিলাইজ দি পিপল এগেনস্ট করাপশন। এটা যদি করতে পারি, দেখবেন অনেক প্রবলেম আমরা সলভ করতে পারব। এজন্যই আজকে আমাদের মবিলাইজ করতে হবে পিপলকে। আমাদের সোশ্যালি বয়কট করতে হবে যে লোকটা ঘুষ খায়, যে লোকটার মাইনে হাজার টাকা কিন্তু ব্যয় করে পাঁচ হাজার টাকা। যে লোকটার ইনকাম তিন হাজার টাকা কেমন করে সে ব্যয় করে পনের হাজার টাকা? এই যে জিনিসটা সমাজের কাছে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে এবং তাহলেই সমাজ তথা পিপলের আপনাদের উপর আস্থা ফিরে আসবে।”

    ১০. শোষনমুক্ত সমাজ গড়ে তুলে বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য একটা কার্যকরী ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য বাকশালের গঠন। একদলীয় শাসন নয় বরং বাংলাদেশকে তিনি একটি পরিবার হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশ তাঁর পরিবারই ছিলো।

    বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষন শেষ করেছিলেন তাঁর চিরায়ত আবেগ দিয়েই।

    “…. যদি আমরা একটা শোষনহীন সমাজ গড়তে পারি, যদি করাপশন বন্ধ করতে পারি, আমি বিশ্বাস করি, ইনশাল্লাহ, বাংলার মাটিতে যা এখনো আছে, ৭ কোটি লোক হলেও বাংলার মানুষ না খেয়ে মরতে পারে না। আই হ্যাভ সিন দ্যাট। আমি আপনাদের কাছে ক্ষমা চাই কারণ আই হ্যাড বিকাম ইমোশনাল।

    …. লেট আস ওয়ার্ক টুগেদার। উই আর নাউ ওয়ান পার্টি। পার্টি মানে কি জানেন, এভরি পার্টি ওয়ার্কার অব মাইন ইজ লাইক মাই ব্রাদার, ইজ লাইক মাই সন। আই ক্রিয়েটেড এ ফ্যামিলি হোয়েন আই অরগ্যানাইজড আওয়ামি লীগ। বাংলাদেশে এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আমি যাইনি। আর পলিটিক্যাল পার্টি মিনস এ ফ্যামিলি- যার মধ্যে আছে আইডিওলজিক্যাল অ্যাফিনিটি। সেজন্য এই পার্টিতে উই আর ওয়ান ফর সাম পার্টিকুলার পারপাসেস, হোয়্যারওভার উই আর। আমাদের আদর্শ হল, বাংলাদেশকে স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ইজ্জতসহকারে দুনিয়াতে বাঁচিয়ে রাখা, বাংলার দুঃখী মানষকে পেট ভরে খাবার দিয়ে শোষনমুক্ত সমাজ গঠন করা এবং যেখানে অত্যাচার অবিচার জুলুম থাকবে না, দূর্নীতি থাকবে না। লেট আস অল ট্রাই ফর দ্যাট। আসুন আমরা চেষ্টা করি সে সম্পর্কে সকলে মিলে।

    আপনাদেরকে অশেষ ধন্যবাদ।”

    বঙ্গবন্ধুর ভাষনের প্রতিটা বিশ্লেষণ প্রমাণ করে বাকশাল নিয়ে যে অপপ্রচার আজও আমাদের রাজনীতিতে বিরাজমান তা দুর করা জরুরী। প্রজন্মের কাছে যতো বেশী করে আলোচনা করা যাবে ততো বেশী বাংলাদেশের রাজনীতির সুষ্ঠু ধারা প্রতিষ্ঠিত হবে। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষনটি বস্তুগত বিশ্লেষনে থিসিস হিসেবেও গণ্য করার দাবী রাখে।।

    লেখক: এক্টিভিস্ট

    © এই নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
    / month
    placeholder text

    সর্বশেষ

    রাজনীাত

    বিএনপি চেয়ারপারসনের জন্য বিদেশে হাসপাতাল খোজা হচ্ছে

    প্রভাতী সংবাদ ডেস্ক: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্যে আবেদন করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা মনে করেন আবেদনে সরকারের দিক থেকে ইতিবাচক...

    আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ

    আরো পড়ুন

    Leave a reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    spot_imgspot_img