More

    মফস্বলের সাংবাদিকতা কি আসলেই কোন পেশা হতে পারে?

    শাহ জামাল শিশির

    সাংবাদিকদের বলা হয় জাতীর বিবেক, সমাজের দর্পন। রাষ্ট্র কিংবা সমাজব্যবস্থার নানা ভাল ও খারাপ খবর পরিবেশন করাই একজন সংবাদকর্মীর কাজ। সমাজের কোথায় কি ঘটলো এইটার নির্ভরযোগ্য সংবাদ কিন্তু সাংবাদিকদের মাধ্যমেই পাওয়া যায়।

    সাংবাদিকতা আসলেই কি কোন পেশা?

    এমন প্রশ্নের উত্তর আসলে দেয়াটা অনেক কঠিন কাজ। যদি পেশা হয় তাহলে আপনার মাসিক বেতন কত? আপনার প্রতিষ্ঠান আপনাকে কি কি আর্থিক সুবিধা দেয়? আমার জানামতে অধিকাংশ সংবাদকর্মীই এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যায়।

    আমার দৃষ্টিকোনে মফস্বলে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নেয়ার সুযোগ একেবারেই নেই। তবুও একশ্রেণির সংবাদকর্মী সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। তাদের বিষয়েও কিছু বলবো হয়তো।

    ঢাকার বাইরে বেতনভুক্ত সাংবাদিক খুব কম আছেন। জেলা শহরগুলোতে সংবাদকর্মীরা সামান্য বেতন পেলেও উপজেলা পর্যায়ে সেটা হাতেগোনা। যারা আছেন তাদের মাসিক বেতন কোনভাবেই সংসার চালানোর মত যথেষ্ঠ নয়।

    শব্দশ্রমিক কিংবা সাংবাদিক যাই বলেন না কেন তাদেরকে যদি আপনি নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক সুবিধা না দেন তাহলে নিশ্চয় তাদের কাছ থেকে পেশাদারিত্ব আশা করা যায়না।

    আমি সবসময় একটা কথা বলি। পেশা হিসেবে নয় বরং মফস্বল সাংবাদিকতাকে নেশা হিসেবে নেয়া উচিৎ, প্যাশন হিসেবে নেয়া উচিৎ।

    সম্প্রতি ঘোষনা এসেছে, স্নাতক ছাড়া এখন থেকে আর কেও সাংবাদিক হিসেবে নিবন্ধিত হতে পারবেনা। নিঃসন্দেহে অনেক ভাল উদ্যোগ। তবে একজন স্নাতকপাশ সাংবাদিকের আর্থিক দায়বদ্ধতাও তাদের নেয়া উচিৎ বলে মনে করি।

    প্রতিষ্ঠান তাকে বেতন দিবেনা জেনেও সাংবাদিকতা পেশায় আসার জন্য ছটফট করে অনেকেই। প্রতিদিন নতুন নতুন সাংবাদিকের জন্ম হচ্ছে। পেশা কিংবা নেশা হিসেবে সাংবাদিকতায় আসা মানুষদের নিয়ে কিছু লিখবো।

    এরা কিভাবে চলে, এদের ইনকামের উৎস কোথায় সেটা নিয়েই আজকের এই লেখা। নিচের আলোচনাকে আপনারা পজিটিভ সাংবাদিকতা হিসেবে ধরতে পারেন। নেগেটিভ সাংবাদিকতা নিয়ে অবশ্যই লিখবো।

    ১। একটি প্রতিষ্ঠানের দেয়া আর্থিক সুবিধায় মফস্বলের কোন সাংবাদিক চলতে পারেনা (হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া)। এজন্য অনেক সাংবাদিক কয়েকটি হাউজে কাজ করেন। সবজায়গা থেকে প্রাপ্ত অর্থ একজায়গায় করলে হয়তো একটা হ্যান্ডসাম এমাউন্ট হয়ে যায়।

    ২। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, সাংবাদিকতার বাইরে তারা অন্য পেশায় জড়িত। শখের বসে অবসরে কিংবা আর্থিক সুবিধা বিবেচনা না করেই তারা সাংবাদিকতায় এসেছেন। সাংবাদিকতায় এদের অর্থ উপার্জন করতেই হবে এমন কোন মোহ নেই। প্রতিষ্ঠান যদি তাদের সামান্য সম্মানি দেয় তাতেই তারা খুশি।

    ৩। অনেক সাংবাদিক আছেন যারা সম্পুর্ণ বিনা বেতনে কাজ করেন। এদের মূলত কোন কাজকাম নেই। নামের শেষে সাংবাদিক লেখা থাকবে, নিজের নামে লেখা প্রকাশ হবে এতেই তারা খুশি।

    ৪। কিছু সাংবাদিক আছেন যারা বিজ্ঞাপন নিয়ে কাজ করেন। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিজ্ঞাপন পত্রিকায় ছাপিয়ে প্রাপ্ত কমিশন দিয়েই তিনি চলেন।

    পজিটিভ সাংবাদিকতার বাইরে নেগেটিভ সাংবাদিকতা আছে। আমাদের সমাজব্যবস্থায় সেটা নিয়েই আলোচনা কিংবা সমালোচনা হয় বেশি।নেগেটিভ সাংবাদিকতা নিয়েও কিছু লেখা যেতে পারে।

    ১. অনলাইনে সামান্য অর্থ খরচ করে একটা নিউজ ওয়েবসাইট বানিয়ে অজ্ঞরাও হয়ে যাচ্ছেন পত্রিকার মালিক কিংবা সম্পাদক। এদের উদ্দেশ্য খারাপ।

    ২. বাইক কিংবা গাড়ির সামনে প্রেস স্টিকার লাগিয়ে চলাচল করা সাংবাদিকের সংখ্যা নেহায়েত কম নই। এক লাইন লিখতে গেলে কলম ভাঙে তারাও সাংবাদিক।

    ৩. দুই উদ্দেশ্যে এরা সাংবাদিকতা করে। এক হলো নামের শেষে সাংবাদিক শব্দ যোগ করা। দুই হলো এরা মনে করে সাংবাদিক হলেই অনেক অপকর্ম করা যায় কিংবা অপকর্ম করেও পার পাওয়া যায়।

    এইসব সাংবাদিকদের অর্থ উপার্জনঃ

    একশ্রেণির সাংবাদিক আছেন যারা জাস্ট চাঁদাবাজির জন্যই সাংবাদিকতা করেন। যারা অপেক্ষাকৃত দূর্বল কিন্তু টুকটাক অপরাধ করে চলেছেন তাদের নামে রিপোর্ট করার ভয় দেখিয়ে অনেক সাংবাদিক চাঁদাবাজি করেন।

    সাংবাদিকতায় অর্থ উপার্জনের আরেকটি উপায় আছে। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে টার্গেট করে তাদের কর্মগুলো নিউজ বানিয়ে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা। অর্থাৎ কারো প্রোগাম কভার করে সেটার নিউজের জন্য সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে টাকা নেওয়া।

    একশ্রেণির সাংবাদিক আছেন যাদেরকে পত্রিকা বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়। বাধ্য হয়েই তারা হকারি করেন। মালিকপক্ষ বলে দেন প্রতিনিধিকে মাসিক এত পরিমান পত্রিকা বিক্রি করতে হবে।

    কিছুদিন আগে অনলাইনে একটি অডিও রেকর্ড ফাঁস হয়েছিল। যেখানে স্পষ্ট প্রতিয়মান যে একটি স্বনামধন্য টিভি চ্যানেলে কাজ করার জন্য প্রতিনিধিকে উলটো অফিসে টাকা পাঠাতে হয়।

    পরিত্রাণের উপায়ঃ

    ১. সাংবাদিকদের অনেকক্ষেত্রে মালিকপক্ষ চাঁদাবাজ বানাচ্ছেন। এইসব মালিকপক্ষ ভাল হয়ে গেলে মফস্বল সাংবাদিকও ভাল হয়ে যাবে।

    ২. সাংবাদিকদের একটি নির্দিষ্ট সম্মানির আওতায় আনতে হবে। যাতে তারা সম্পূর্ণ পেশাদারিত্বের সাথে এই কাজ করতে পারে।

    ৩. সাংবাদিকতা করার যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করে তাদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিন।

    ৪. যারা সাংবাদিক নামটা বিক্রি করে খায় তাদের আইনের আওতায় আনুন।

    অনেক কিছুই লিখে ফেললাম। কাওকে ছোট করা কিংবা কষ্ট দেয়ার জন্য এই লেখা লিখিনি। বরং মফস্বল সাংবাদিকতার দুর্দশা সম্পর্কে কিছু লেখার চেষ্টা করেছি।

    সাংবাদিকতা একটা মহান পেশা, সম্মানের পেশা। সাংবাদিকরা শোষিত, নিপীড়িত ব্যক্তির বন্ধু। দিনশেষে একটা চরম সত্য কথা হলো এই মহান পেশাটাকে মফস্বল পর্যায়ে সততার সাথে টিকিয়ে রাখতে সকলকে সম্মানীর আওতায় আনতে হবে।

    এই সমস্যার সমাধান না করলে মফস্বল সাংবাদিকতা কখনোই পেশা হিসেবে গ্রহণ করবেনা।

    শাহ জামাল শিশির
    সাংবাদিক ও লেখক ‘দৈনিক সমাজের কথা’

    © এই নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
    / month
    placeholder text

    সর্বশেষ

    রাজনীাত

    বিএনপি চেয়ারপারসনের জন্য বিদেশে হাসপাতাল খোজা হচ্ছে

    প্রভাতী সংবাদ ডেস্ক: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্যে আবেদন করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা মনে করেন আবেদনে সরকারের দিক থেকে ইতিবাচক...

    আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ

    আরো পড়ুন

    Leave a reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    spot_imgspot_img