More

    ম্যাকনামারা থেকে জাভেদ প্যাটেল; একটি দেশের মেরুদন্ড সোজা হবার উপাখ্যান

    শেখ হাসিনা’র ভূমিকা অবিস্মরণীয়

    মুশফিক আব্দুল্লাহ:

    স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই রবার্ট ম্যাকনামারার সাথে তাজউদ্দীন আহমেদের সেই ঘটনাটা সুবিখ্যাত। সদ্য স্বাধীন বিধ্বস্ত বাংলাদেশে এসে রবার্ট ম্যাকনামারা তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের সাথে দেখা করতে চান। মহান মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন অবস্থান নিয়ে ক্ষুব্ধ বঙ্গতাজ নারাজি হলেও বিভিন্ন বাস্তবতার কারণে দেখা দিলেন।

    ম্যাকনামারা যখন জানতে চাইলেন বাংলাদেশের কী লাগবে সহায়তা হিসেবে তখন তাজউদ্দীন আহমেদ জবাব দিলেন যে আমাদের অনেক গরু লাগবে। বিস্মিত ম্যাকনামারা যখন প্রতিধ্বনি করলেন যে আপনাদের গরু লাগবে? তাজউদ্দীন বললেন যে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিরা আমাদের চাষীদের গরু খেয়ে ফেলেছে বা ধরে নিয়ে গেছে।

    আমাদের জমি চাষ করতে হলে অনেক গরুর প্রয়োজন। শুধু গরু না, গরু বাঁধার জন্য অনেক দড়িও লাগবে বলে জানালেন তিনি। অপমানিত হলেও ম্যাকনামারা সারাজীবন অকুন্ঠ প্রশংসা করে গেছেন তাজউদ্দীন আহমেদের।

    বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী যখন বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাত করলেন, কুশলাদি বিনিময়ের পর বঙ্গবন্ধুর প্রথম প্রশ্নই ছিল, ইন্দিরাজী, ভারতের সৈন্যরা ফিরে যাবে কবে?

    সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে শত্রুতা নয়; এই নীতিতে বিশ্বাসী বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সরকার কোন সরকারেরই আজ্ঞাবহ তো দূরে থাক, তোষণও করে নি। সুপার পাওয়ার আমেরিকার চোখে চোখ রেখে সমান তালে জবাব দেয়া কিংবা উদ্ধত সৌদি রাজার কথার যুক্তি দিয়ে মাথা হেঁট করে দেয়া একটা সদ্য স্বাধীন দরিদ্র দেশের জন্য অকল্পনীয়ই ছিল বটে। এসব শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুর পাহাড়সম ব্যক্তিত্বের কারণেই সম্ভব হয়েছিল।

    এরপর এল সেই কালরাত। পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট। বাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে কলংকময় দিন। সেদিন অভিভাবক হারালো বাংলাদেশ, দিক হারা হলো বাঙালি জাতি। একাত্তরের পরাজিত হায়েনারা ধীরে ধীরে দখল করে নিতে লাগলো রাষ্ট্রযন্ত্র, জাতির জনক হয়ে গেলেন নিষিদ্ধ এক সত্তা। পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা তখন মোশতাক আর জিয়ার হাত ধরে সবখানে ঘাঁটি করে নিতে লাগলো।

    কালো মেঘের ঘোর অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছিলো গোটা দেশ, গোটা জাতির ভাগ্যাকাশ। পরবর্তী ২৬ টি বছর বাংলাদেশ ছিলো বিদেশী বেনিয়াদের আজ্ঞাবহ দাসের মত। প্রভুর স্তব গাওয়া আর নির্দেশ শোনা ছাড়া কিছুই করণীয় ছিল না তৎকালীন অবৈধ জিয়া আর এরশাদ সরকারের। ঢাকা পরিচালিত হত করাচি আর ইসলামাবাদ থেকে। বিএনপি সরকার এসেও একই ধারা বজায় রাখলো।

    আওয়ামী লীগ প্রথমবার ক্ষমতায় এসেই আবার ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করলো বঙ্গবন্ধুর নীতিতে। পার্বত্য শান্তিচুক্তির মাধ্যমে আভ্যন্তরীন শান্তি প্রতিষ্ঠা করে এবার মিত্রতা তবে অধীনতা নয় এই নীতিতে সকলের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করতে থাকলো। তাই বলে এমন না যে এদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোন দেশ হস্তক্ষেপ করবে আর বাংলাদেশ সেটা চুপচাপ মেনে তাদের সাথে সুসম্পর্ক গড়বে।

    মৈত্রীর বন্ধন থাকলেও জাতীয় স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন বজ্রকঠিন। তাই এদেশের সম্পদ প্রাকৃতিক গ্যাস বিদেশী প্রভুদের কাছে রপ্তানি আর এদেশের মাটিতে বিদেশী সৈন্যদের ঘাঁটি করতে দিতে রাজি না হওয়ায় সম্মিলিত ষড়যন্ত্রে সরতে হলো ক্ষমতা থেকে।

    ওরা জানত শেখ হাসিনা যতদিন আছেন, এদেশের স্থায়ী কোন ক্ষতি ওরা কখনই করতে পারবে না। দেশকে আফগানিস্তান কিংবা পাকিস্তানের মত অকার্যকর রাষ্ট্র বানাতে ওদের একমাত্র পথের কাঁটা শেখ হাসিনা। তাই তাঁকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে তারা রাষ্ট্রীয় মদদ আর পরিকল্পনায় মনুষ্যত্বকে পায়ে দলে জঘন্য এক হামলা করল শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে একযোগে সরিয়ে দেবার পরিকল্পনা নিয়ে।

    তাঁর ভাই আর বোনদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে প্রাণে রক্ষা পেলেও শারিরীকভাবে চিরস্থায়ী ক্ষতির শিকার হলেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। এবার সরকার জজ মিয়া নাটকের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই জঘন্যতম হওয়া হামলাটাতে প্রলেপ দিল সরকারি সম্পৃক্ততার নোংরা নাটকের মাধ্যমে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন শেখ হাসিনা নিজেই ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে হামলার নাটক করেছেন সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলবার জন্য।

    এরপর পদ্মা মেঘনা আর যমুনা নদী দিয়ে অনেক পানি বয়ে গেল। বিএনপি জামায়াতের ক্ষমতা ধরে রাখার নোংরা কৌশলকে পরাজিত করে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মিথ্যে মামলার জাল ভেদ করে তিনি আবির্ভূত হলেন স্বমহিমায়। এদেশের ইতিহাসে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনগুলোর মধ্যে ৭৩ সালের নির্বাচনের পর সবচেয়ে বড় বিজয় নিয়ে সরকার গঠন করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী হলেন ডুবতে থাকা এক জাহাজের।

    বাকিটুকু যেন ফিনিক্স পাখির গল্প। সব সূচকে তলানির দিকে থাকা একটি দেশকে তুলে আনলেন তিনি মর্যাদার আসনে। বিশ্বসভায় করে নিলেন সম্মানজনক অবস্থান।

    যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় এই বিচার প্রতিহত করতে দেশি বিদেশী নানা জায়গা থেকে শত শত চাপ আসে ঐ কুলাঙ্গারদের জীবনরক্ষায়। কিন্তু বাংলাদেশ মাথা নত করে নি। জাতিসংঘের মহাসচিব পর্যন্ত এই বিচার প্রক্রিয়াকে এবং বিচারের রায়কে পুনর্বিবেচনা করার জন্য শেখ হাসিনার কাছে অনুরোধ করেন। তিনি জানতেন না যে বঙ্গবন্ধুকন্যা তাঁর পিতার রক্তের যোগ্য উত্তরসূরি। তিনি কোন চাপের কাছে মাথা নত করেন না।

    দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তিনি মহাসচিবকে জানিয়ে দেন যে আইন তাঁর নিজস্ব গতিতে চলবে এবং এই বিচারে হস্তক্ষেপ করার কোন সুযোগ নেই। মানবতার ফেরিওয়ালাদের তিনি বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে একাত্তরের শহীদ এবং নির্যাতিত পরিবারের সদস্যদের চোখ দিয়ে দেখতে বলেন। নানা হুমকি, নানা অনুরোধ আর নানা প্রলোভন পায়ে ঠেলে অটল হয়ে তিনি কলঙ্কমুক্ত করেন বাংলার মাটিকে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পরিষ্কার বার্তা জানিয়ে দেন যে বাংলাদেশ এখন আর মাথা নত করে থাকবে না, এদেশ তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেবে।

    পদ্মাসেতু নির্মাণে মিথ্যা অজুহাতে বিশ্বব্যাংক সরে যায় অর্থায়ন থেকে। তারা ভেবেছিলো শেখ হাসিনা মাথা নত করবে। বাংলাদেশ তাদের আজ্ঞাবহ হয়েই থাকবে। তাদের এই ভ্রান্ত ধারণা তাদের দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে বেশি সময় লাগে নি। নিজেদের টাকায় পদ্মাসেতুর মত সেতু বানিয়ে বিদেশী বেনিয়াদের বুঝিয়ে দিয়েছেন যে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনও আপস নয়।

    সেই বিদেশী বেনিয়ারা ক্ষমা চেয়ে ফিরে এসেছে। তারা ভেবেছিল পদ্মা সেতুর মত বিশাল প্রকল্প বাংলাদেশ নিজেদের টাকায় করতে পারবে এটা কখনও সম্ভব হবার নয়। তারা নোংরা ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে সরকারকে নত করতে চেয়েছিলো। জননেত্রী শেখ হাসিনা সেই যুযোগ তাদের দেন নি। পরবর্তীতে তাদের মিথ্যা অভিযোগ তাদের দেশের আদালতেই মিথ্যা প্রমাণ হয়েছে। আজ তারা মুখিয়ে থাকে বাংলাদেশের এই স্বপ্নের উন্নয়ন যাত্রার যেকোন প্রকল্পের উন্নয়ন অংশীদার হতে।

    ব্রিটিশ সরকারের দপ্তর আজ ভুল রিপোর্ট দিলে বাংলাদেশ চুপচাপ মাথা নিচু করে তা মেনে নেয় না। চরম বিক্ষুব্ধ হয়ে তাদের হাইকমিশনারকে ডেকে পাঠায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। জানিয়ে দেয় আমাদের ক্ষোভ। মাথা নিচু করে মিনমিনে গলায় হাইকমিশনার বলে যান এ দেশের ক্ষোভ তিনি তার দেশের দপ্তরে জানিয়ে দিবেন, বাংলাদেশের সাথে তাদের সম্পর্ককে তারা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে মূল্যায়ন করে এবং এদেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে তারা কোন পক্ষাবলম্বন করে না।

    ওরা ভুলে গিয়েছিল এই দেশ এখন প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের প্রভুদের কথায় কথায় আর জ্বি হুজুর বলে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজ গণমাধ্যমে বলেন যে আমাদের উপদেশ দেয়ার আগে আয়নায় নিজেদের মুখ দেখে নিতে। বাংলাদেশ এখন আর কোন স্তাবক দেশ নয়, বাংলাদেশ এখন শিরদাঁড়া সোজা রেখে বিশ্বমোড়লদের চোখে চোখ রেখে কথা বলে।

    যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আর পদ্মাসেতু থেকে আমরা যে পথে যাত্রা শুরু করেছি, সেই পথ সম্মানের, সেই পথ আত্মশ্লাঘার। এই যে সাহস, এই যে সোজা শিরদাঁড়া, এই যে সত্য বলার ঔদ্ধত্য, এটা এসেছে বাংলাদেশ আজ স্বনির্ভর বলে। এই একটা কারণে আওয়ামী লীগ সরকার এবং এর রূপকার শেখ হাসিনা এদেশের জনগণের মনের মণিকোঠায় অম্লান হয়ে থাকবেন।

    রবার্ট ম্যাকনামারা থেকে আজ ব্রিটিশ হাইকমিশনার জাভেদ প্যাটেল আজ এই ঘটনায় একই সূত্রে গাঁথা হয়ে গেছেন।

    এই বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ, এই বাংলাদেশ শেখ হাসিনার বাংলাদেশ, এই বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ।

    © এই নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
    / month
    placeholder text

    সর্বশেষ

    রাজনীাত

    বিএনপি চেয়ারপারসনের জন্য বিদেশে হাসপাতাল খোজা হচ্ছে

    প্রভাতী সংবাদ ডেস্ক: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্যে আবেদন করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা মনে করেন আবেদনে সরকারের দিক থেকে ইতিবাচক...

    আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ

    আরো পড়ুন

    Leave a reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    spot_imgspot_img