More

    একজন নারী পরীমণি ও পুরুষের অনুভূতিদন্ড

    শিশির ওয়াহিদ

    ‘অভিনেত্রী পরীমণি কেন অত রাতে বাইরে গেলেন’- আমরা এই প্রশ্ন অনেকেই করছি। কিন্তু কেউ প্রশ্ন করছেনা, “ঐ মধ্যবয়সী পুরুষ অত রাতে কী আশায়, কী কারণে ওখানে রয়েছেন!”
    আমরা নারী-পুরুষের অধিকার সমতায় অনেক দূর এগিয়েছি, কিন্তু দুঃখের বিষয় মনমানসিকতায় এখনো এগোতে পারিনি।

    আরও পড়ুন: জ্ঞান ফিরে দেখেন গায়ের কাপড় ছেড়া-ভেজা: নির্যাতনের বর্ণনায় পরিমনি

    ‘নায়িকা পরীমণি’কে ব্যক্তিগত ভাবে আমার ভালো লাগেনা, এটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়। আমি প্রথমত চাইওনি এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে। কিন্তু আশেপাশের মানুষগুলোর এমন-এমন কথা কানে ভাসছে, যাতে মন্তব্য না করে থাকতে পারলাম না।

    নায়িকা পরীমণিকে আপনার-আমার পছন্দ নাও হতে পারে। এটা দোষের কিছু নয়। কিন্তু আমাদের মানতে হবে প্রথমত সে একজন মানুষ, দ্বিতীয়ত একজন নারী। অভিনয় জগতের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত তারকা তিনি, এটা তার পেশা। আপনি লোলুপ দৃষ্টিতে তার ঝাকানাকা গান দেখতে পারছেন, দেখার ফাঁকে শরীরের ভাজ গুলোও গুণে ফেলছেন, তাহলে সেই মানুষটার বিপদে তার কর্মকে দোষ আগে কেন দিচ্ছেন আপনি? এই দোষ দেওয়াটা দোষের। সে আজকের পরীমণি আপনাদের জন্য; এটাতো ভুলে গেলে চলবেনা। বিপদের দিনে তার কর্ম, চলাফেরার দোষ দিবেন এটাওতো মেনে নেওয়া যাবেনা।

    আমরা আরো দোষারোপ করি নারী ধর্ষিত-নির্যাতিত হয় পোশাকের কারণে, চলাফেরার কারণে, লাইফস্টাইলের কারণে। এগুলো শুধুই প্রলাপ।
    কোনো নারী পোশাকে ধর্ষিত হয়না, চলাফেরায় ধর্ষিত হয়না। ধর্ষিত হয় পুরুষের বিকৃত মানসিকতার কাছে, পুরুষের দন্ডায়মান অনুভূতিদন্ডের কাছে। আপনার অনুভূতিদন্ডের দ্বায় তো জোরপূর্বক নারীর উপর চাপিয়ে দিতে পারেন না। ব্যক্তিস্বাধীনতা সবার আছে, কার লাইফস্টাইল কেমন হবে, এটা ঠিক করে দেওয়ার অধিকার আমার কিংবা আপনার নেই।

    আমি খেয়াল করেছি, এপর্যন্ত সমাজে কোনো নারী নির্যাতন কিংবা ধর্ষণের শিকার হলেই আমরা সর্বাগ্রে সেই নারীটির দোষত্রুটি খোঁজার চেষ্টা করি। সেটা পরীমণির ক্ষেত্রে হোক, আর যার ক্ষেত্রেই হোক। এরকম একতরফা নেতিবাচক জাজমেন্টাল প্রবণতা কেন আমাদের মাঝে!

    ইউরোপের দেশগুলোতে নারীরা রাত ২ টার দিকেও একা রাস্তায় চলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, কিন্তু আমার দেশে একজন নারী দিনের বেলা সামান্য একটা বাসে উঠতে কেন ভয় পায়! এই প্রশ্ন করেছেন কি কখনো? যদি না করে থাকেন, তাহলে পরীমণির মতো নির্যাতিত নারীদেরকে দোষ দেওয়ার ন্যূনতম অধিকার আপনার নেই।

    দেশে প্রচলিত আইন আছে, বিচার বিভাগ আছে। আমাদের তো আগে দেখতে হবে সেগুলোর তদন্ত ও রায় কোনদিকে গড়ায়, তবেই তো বিচক্ষণের ন্যয় মন্তব্য করতে পারি; এর আগে নয়। কিন্তু আমরা কেন জানি একটু বেশিই অধৈর্য প্রবণ জাতি! হটকারি মন্তব্য না করলে আমাদের পশ্চাৎদেশের জ্বলন যেন বন্ধই হতে চায় না।

    এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে আমরা ভোগবিলাসের পণ্য হিশেবে গণ্য করি বহু আগ থেকে। তাই বলে পূর্বপুরুষের ন্যয় সেই পুরুষতান্ত্রিকতাকে সমর্থন দিয়ে গেলাম, তা আদৌ সমর্থন যোগ্য নয়। এটাতো মানবিকতার সাথে মস্ত বড়ো অন্যায়।

    অভিনেত্রী পরীমণি একজন নারী হিশেবে তার নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, তার সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, নিশ্চয় তার নিজ দিক থেকে এটা যুক্তিসঙ্গত। তার ক্যারিয়ারে অতীতের নেতিবাচক ছাপ থাকতে পারে। এই বিষয়টিতে তার সেই অতীত টেনে এনে জুড়ে দেওয়াটা কোনো সুস্থ্য মানুষের কাজ হতে পারেনা৷ আপনি নিজে যেমন জানেন না ঘটনার সত্যতা কী, আমিও জানিনা। হতে পারে ঘটনা হুবহু সত্য, আবার হতে পারে ঘটনা ভিন্ন। কিন্তু এই হতে পারা-না পারার মাঝখানে আমাদের তড়িৎ মন্তব্যের ফলস্বরূপ কাউকে যেন মিথ্যা দোষারোপ কিংবা মানহানি যেন না করি, এই দিকটাতে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন।

    অভিযোগ হয়েছে, অভিযুক্তরা গ্রেফতারও হয়েছে। এখন দেখার বিষয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত প্রতিবেদন কী বলে। আমাদের হটকারি বিচারিক মনোভাবের কারণে কোনো অপরাধী যেন সুযোগের সদ্-ব্যবহার না করতে পারে, এই দিকটাতে সজাগ থাকতে হবে। নইতো তনু, মুনিয়া কিংবা ফেনীর নুসরাতের মতো পরিণাম সমাজে বাড়তে থাকবে, কমবে না।

    লেখক : শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মী

    © এই নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
    / month
    placeholder text

    সর্বশেষ

    রাজনীাত

    বিএনপি চেয়ারপারসনের জন্য বিদেশে হাসপাতাল খোজা হচ্ছে

    প্রভাতী সংবাদ ডেস্ক: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্যে আবেদন করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা মনে করেন আবেদনে সরকারের দিক থেকে ইতিবাচক...

    আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ

    আরো পড়ুন

    Leave a reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    spot_imgspot_img