More

    হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের রূপরেখা

    হাসান মোরশেদ

    একেবারে সাম্প্রতিক ডাটা হাতে নেই, একটু পেছনের ডাটা দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচন বিষয়ে আলাপ করা যাকঃ

    ১৯৪৭ এর দেশভাগের সময় পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান জনসংখ্যা ছিলো ২৫-২৯%। প্রায় ৭ থেকে ১০ লক্ষ মুসলমান এসময় পূর্ব বঙ্গে চলে আসেন।

    ২০১১ এর জনশুমারি অনুযায়ী, ছয় দশকে সেখানে মুসলমান সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭.১% যা আবার মোট ভোটারের প্রায় ৩০%।

    ছয় দশকে এতো বাড়লো কী করে, সে আরেক কাহিনী। রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের সুবিধা ভোগে যে জনগোষ্ঠী যতো পিছিয়ে , তার জনসংখ্যা ততো যায় বেড়ে।

    মোট মুসলিম জনগোষ্ঠীর ৭৭% হচ্ছে বাঙালী মুসলমান, এঁরা মফস্বল ও গ্রাম এলাকায় থাকেন। কলকাতা শহরে থাকা ও ভারতের নানা দিক থেকে আসা উর্দুভাষী মুসলমান ২৩%।

    এই শুমারীতে বলা হয়েছে বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে যাওয়া মুসলমানরাও মোট ভোটারের ৫%
    এদিকে সেই ছয় দশকে ভারতে শরনার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়া নিম্নবর্গীয় হিন্দু( মতুয়া নামে পরিচিত), মোট ভোটারের ১৫%।

    ঐতিহাসিকভাবে গোটা ভারতে জাতীয় কংগ্রেস মুসলমানদের রাজনৈতিক আশ্রয় হিসেবে স্বীকৃত হলেও পশ্চিম বঙ্গে সেটা ঘটেনি। এখানে মুসলমানদের আশ্রয় ছিলো বামপন্থীরা, বিশেষ করে সিপিএম। সিপিএম এর নিরংকুশ ভোট ব্যাংক ছিলো মুসলমানরা।

    যদিও সাড়ে তিনদশকে মুসলমানদের জীবনমানে কোন পরিবর্তন ঘটেনি, বরং দারিদ্র বেড়েছে ফলে জনসংখ্যাও বেড়েছে( এতে সিপিএম লাভবান হয়েছে)।

    ২০০৬ সালে বিচারপতি রাজিন্দর সাচার প্রনীত সাচার রিপোর্ট

    মুসলমানদের জীবনমানের দুর্দশা এবং তাঁদের রাজনীতির গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হবার প্রমান হাজির করে। সাচার রিপোর্ট দেখায়- যেখানে মুসলমান বেশী সেখানে শিক্ষার সুযোগ সবচেয়ে কম।

    গোটা ভারতে মুসলমান ১৪% হলেও সরকারী চাকরীতে আছে মাত্র ২.৫%। ২০১০ সালে মমতা ব্যানার্জি এই ৩০% ভোট ব্যাংকের মালিক হন। নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরে কৃষকদের অধিকার আদায়ে তাঁকে দেখা যায় আপোষহীন চরিত্রে।

    তিনি বিশেষ করে দরিদ্র, কৃষক মুসলমানদের আস্থা অর্জন করতে থাকেন। মুসলমানদের জন্য আলাদা কিছু স্কিম যেমন ইমাম ভাতা, মাদ্রাসায় ভর্তি হলে মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে সাইকেল- এসব চালু করেন।

    এবারের নির্বাচন নিয়ে বিজেপি ছিলো আগ্রাসী। তারা টার্গেট করেছিলো ১৫% মতুয়া ভোট, সেই সাথে শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত হিন্দুদের ভোট। মতুয়া ভোট নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের ওরাকান্দিতে নরেন্দ্র মোদীর উড়ে আসা।

    এদিকে বামপন্থীরা ধর্মজীবি আব্বাস সিদ্দিকীকে সাথে নিয়ে আশা করেছিলেন তাঁদের পুরনো ৩০% ভোট ব্যাংকে শেয়ার নিতে।

    এখন পর্যন্ত যে ফলাফল তাতে মোটামুটি নিশ্চিত, মুসলমান ভোটের প্রায় শতভাগ মমতা পেয়েছেন। বিজেপির আগ্রাসী প্রচারনায় আতংকিত মুসলমানরা বাম – আব্বাসীদের চেয়ে মমতাকে শক্ত ঢাল ভেবেছেন। বিজেপি কি মতুয়াদের ১৫% ভোট নিশ্চিত করতে পেরেছে? এখনই হয়তো বলা যাবেনা- পরে অনুমান করা যাবে।

    এই নির্বাচনের মাধ্যমে বিজেপি, বাংলার ক্ষমতায় আসলোনা- এটা স্বস্তির। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা কি আসলেই ঠেকানো গেলো? ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন আরো স্পষ্ট হলো।

    পশ্চিম বাংলাকে সাম্প্রদায়িক আগ্রাসন থেকে সত্যি সত্যি ঠেকাতে সংখ্যালঘু মুসলমান, মমতা ব্যানার্জির সরকার এবং সংখ্যাগুরু হিন্দু- সকলকেই আন্তরিক হতে হবে।

    মমতা ব্যানার্জি নিজে একসময় হিন্দুত্ববাদী বিজেপির সাথে কোয়ালিশন করেছেন, বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আশ্রয় নেয়া ইসলামী জঙ্গীদেরও আশ্রয় দিয়েছেন। আবার তিস্তার পানি আটকানো সহ বাংলাদেশ বিরোধী সস্তা শ্লোগানও দিয়েছেন। সাম্প্রদায়িকতার বাজার উর্ধ্বমূখী বলেই সেখানে ভোটের বাজারে বাংলাদেশ বিরোধীতার দর বাড়ছে।

    জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হওয়া বাংলা পক্ষের গর্গ চ্যাটার্জি ( ব্যক্তিগত ভাবে আমার ভালো বন্ধু)ও নরেন্দ্র মোদীকে প্রমান করছে ‘বাংলাদেশের দালাল’।

    ভাগ্যিস, বিজেপি হেরেছে। না হলে সেই দায়ও শেখ হাসিনার ঘাড়ে চাপাতো এঁরা। অথচ ঐতিহাসিক ভাবেই আওয়ামী লীগের বিজেপি বান্ধব হবার কোন কারন নেই, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কুটনৈতিক সম্পর্কের দায়বদ্ধতা ছাড়া।

    তৃতীয়বারের মতো মুখ্যমন্ত্রী হয়ে মমতা ব্যানার্জি যদি সত্যিই পশ্চিমবঙ্গকে হিন্দুত্ববাদ থেকে রক্ষা করত চান তাহলে তাঁকেও সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে হবে। বাংলাদেশ বিরোধী সস্তা রাজনীতি বাদ দিয়ে মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন কীভাবে করতে হয় সেটা বাংলাদেশ থেকে শিখতে হবে।

    তাঁর জন্য শুভ কামনা।

    © এই নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
    / month
    placeholder text

    সর্বশেষ

    রাজনীাত

    বিএনপি চেয়ারপারসনের জন্য বিদেশে হাসপাতাল খোজা হচ্ছে

    প্রভাতী সংবাদ ডেস্ক: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্যে আবেদন করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা মনে করেন আবেদনে সরকারের দিক থেকে ইতিবাচক...

    আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ

    আরো পড়ুন

    Leave a reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    spot_imgspot_img