More

    বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ’দের সক্ষমতা বনাম আমলাতন্ত্র

    মুকুল আহমেদ

    ব্যুৎপত্তিগত অর্থে আমলাতন্ত্র বলতে বােঝায় টেবিলে বসে পরিচালিত সরকার বা শাসন ব্যবস্থাকে (Desk-government) ।

    প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আধুনিক শাসন ব্যবস্থায় সরকারের রাজনৈতিক অংশ বা স্থায়ী অংশ, মূলত অভিজ্ঞ, বেতনভুক কর্মচারীবৃন্দ অর্থাৎ আমলাদের দ্বারা পরিচালিত হয়। এই পরিচালিত শাসন ব্যবস্থা আমলাতন্ত্র নামে পরিচিত। এককথায় বলা যায়, সরকারি কর্মচারীদের নিয়েগড়ে ওঠা একটি সংগঠন বা গােষ্ঠীবিশেষ হল আমলাতন্ত্র।

    আরও পড়ুন: বাকশালের আমলাতন্ত্র বনাম বর্তমানের আমলাতন্ত্র

    একটি গনতান্ত্রিক দেশে রাজনীতির মাঠ ফাকা থাকলে আমলাতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা তৈরি হবে সেটাই স্বাভাবিক। ৭১এর পরে এদেশে স্বাধীনতা পক্ষের শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোন দল তৈরি না হওয়া ও একটি কারণ।

    ২০০৮ সালের পরে এদেশে প্রকৃত পক্ষে রাজনীতির ময়দান শূন্য। সেই শূন্য জায়গায় ছড়ি ঘোরানোর সুযোগ নিয়েছে আমলারা। রাজনৈতিক নেতাদের ব্যর্থতাই এর প্রধান কারন।মন্ত্রী থেকে সচিবের ক্ষমতার ব্যবহার বেশি । রাজনৈতিক নেতার থেকে সরকারি আমলার ক্ষমতার ব্যবহার বেশি।

    এটা একদিনে তৈরি হয় নাই। রাজনৈতিক নেতাদের অশিক্ষা, অসচ্ছতা, দূর্নীতি, কালোবাজারি, স্মাগলিং, এবং সরকারের সাথে রাজনৈতিক নেতাদের সমন্বয় হীনতাই প্রধান কারণ।

    বিদেশি বিনিয়োগ থেকে শুরু করে যেকোন সরকারি প্রকল্পে আমলাদের আধিপত্য বিদ্যামান।

    মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সরকার প্রধান। আমরা দেখেছি তিনি প্রতিটি কনফারেন্সে আমলাদের প্রাধান্য দিয়েছেন। জেলা থেকে শুরু করে বিভাগীয় পর্যায়ে পর্যন্ত। করোনা কালে যতপ্রকার সরকারি অর্থ সহযোগিতা করেছে সরকার সেটাও আমলাদের মাধ্যমেই।

    দেশের রাজনৈতিক নেতাদের অসচ্ছতা এবং তৃনমুল পর্যায়ের নেতাদের সাথে সমন্বয় হীনতা এর প্রধান কারন।ইচ্ছা করলেই রাতারাতি আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা বন্ধ করা যাবে না।এর থেকে উত্তরন রাজনৈতিক নেতাদের ই করতে হবে।

    আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ এবং জাতীয় পার্টির বর্ষীয়ান নেতা কাজী ফিরোজ রশিদ জাতীয় সংসদে আক্ষেপের সাথে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রক্ষাপেট তুলে ধরেন।দুংখের এবং পরিতাপের বিষয় আওয়ামী লীগ এবং সরকারের মেলবন্ধনের অভাবে এই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।

    আমলাতন্ত্র একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান। এটা দল, মত, শ্রেণি ও যাবতীয় সংকীণর্ মোহের ঊর্ধে থেকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে চলে। আমলাতন্ত্রের সরকারি কমর্চারীরা তাদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও বিচক্ষণতার দ্বারা সুব্যবস্থিত সাংগঠনিক নীতিমালার ভিত্তিতে কতর্ব্য পালন করে বলে খুব সহজেই সমষ্টিগত লক্ষ্য অজর্ন করা যায়।

    কতর্ব্য পালনের সময় আমলাগণ কোনো বিশেষ শ্রেণির বা সম্প্রদায়ের স্বাথের্র দিকে লক্ষ্য না করে সবর্জনীন স্বাথের্র কথা চিন্তা করেন এবং এভাবে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সাম্য, নিরপেক্ষতা, উদারতা প্রভৃতি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ সাধনে কাযর্কর ভ‚মিকা পালন করে। আমলাতন্ত্র একপেশে হলে গণতন্ত্রের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।

    ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর পর তৎকালীন পূবর্বাংলা আজকের বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নে বাধাপ্রাপ্ত হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তথা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার জন্য পাকিস্তানের ২৪ বছর এবং বাংলাদেশের ৪৭ বছর মোট ৭১ বছরের ইতিহাসের দিকে নজর দিলে দেখা যায় আমলাতন্ত্র রাজনৈতিক বিকাশের পথে বাধা সৃষ্টি করছে।

    ৫৪-এর প্রাদেশিক নিবার্চনের পর রাজনৈতিক ককর্মকাণ্ডের পরিধি বিস্তৃত হয়নি বরং রাজনীতিবিদদের ভুল বোঝাবুঝির সুযোগে সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে নেয়। প্রথমে ইস্কান্দার মীজার্ এবং তার পথ ধরে আইয়ুব খান রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে।

    আইয়ুব খান প্রায় ১০ বছরেরও বেশি সময় ক্ষমতায় ছিলেন। সব রাজনৈতিক কমর্কান্ড নিষিদ্ধ করে তিনি মৌলিক গণতন্ত্রের নামে নিজেকে রাষ্ট্রপতি পদে আসীন করেন। তার সময়ের শেষদিকে ছাত্র জনতার সম্মিলিত আন্দোলনের ফলে গণআন্দোলন শুরু হয় যা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং ’৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আইয়ুব খানের পতন ঘটে।

    কিন্তু রাজনৈতিক বিকাশ সেই মাত্রায় হয়নি। এরই মধ্যে ’৬৬-এর ৬-দফা কেন্দ্রিক আন্দোলন। অবশেষে ’৭০-এর সাধারণ নিবার্চনের সুযোগ সৃষ্টি করে। ’৭০-এর নিবার্চন পাক-শাসকগোষ্ঠী মেনে না নেয়ায় আবার সামরিক আমলাতন্ত্রের অধীনে নিযার্তন শুরু হয়।

    আর পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের জনগণ সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যদিয়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নে আমলাতন্ত্র ও আমলাদের ভূমিকা বিতকির্ত হয়ে পড়ে।

    ১৯৯১ সালে আবার সংসদীয় পদ্ধতির সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরও রাজনৈতিক মতবিরোধ, ঘন ঘন হরতাল এবং রাজনীতিতে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতা দেখা দেয়।

    রাজনীতিবিদদের এ অসম প্রতিযোগিতায় ইন্ধন জোগায় আমলারা। ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয় এবং রাজনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। আমলাদের সাফল্যগাথা যাই থাকুক না কেন আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণে না রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো বিকল্প নেই।

    কেননা অনিয়ন্ত্রিত সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার করে দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করা হয়।

    বতর্মান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা একটি অতীব গুরুত্বপূণর্ বিষয়। তবে অনিয়ন্ত্রিত আমলাতন্ত্রে দেশের প্রশাসন ব্যবস্থা বলে আর কিছু থাকে না। বিচারিক কাযর্ক্রমেও তার পরোক্ষ প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে ।

    তাই দেশকে বাচাতে হলে, উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে গেলে এবং স্বনিভর্র, ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমলাতন্ত্রকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার কাযর্কর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

    © এই নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
    / month
    placeholder text

    সর্বশেষ

    রাজনীাত

    বিএনপি চেয়ারপারসনের জন্য বিদেশে হাসপাতাল খোজা হচ্ছে

    প্রভাতী সংবাদ ডেস্ক: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্যে আবেদন করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা মনে করেন আবেদনে সরকারের দিক থেকে ইতিবাচক...

    আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ

    আরো পড়ুন

    Leave a reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    spot_imgspot_img