More

    বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা

    জুবায়দা আফরোজ:

    ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের বৃহৎ বদ্বীপ বাংলাদেশের তিনদিকে ভারতবেষ্টিত হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কখনো শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পায়নি। তবে বাংলাদেশের দক্ষিণে ২১ লক্ষ ৭৩ হাজার বর্গ কি.মি আয়তনের বৃহৎ জলরাশি বঙ্গোপসাগরের অবস্থান বিশ্বরাজনীতিতে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত গুরুত্বকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

    ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিল বলেছিলেন-

    ব্রিটেনকে যদি উন্মক্ত সমুদ্র ইউরোপ এই দুয়ের মধ্যে যেকোন একটিকে বেছে নিতে বলা হয় তাহলে ব্রিটেন অবশ্যই উন্মুক্ত সমুদ্রকেই বেছে নিবে

    চার্চিলের এই কথার দ্বারাই একটি দেশের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সমুদ্রের গুরুত্ব ফুটে ওঠে

    বিশ শতকের শুরুর দিকে মার্কিন ভূকৌশলবিদ আলফ্রেড থেয়ার মাহান রাষ্ট্রসমূহের নিরাপত্তা ও শক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে নৌশক্তির গুরুত্ব দেন।

     বিখ্যাত ভূকৌশলবিদ নিকোলাস জে স্পাইকম্যান তার রিমল্যান্ড তত্ত্বে বলেন-

    সমুদ্রবেষ্টিত রাষ্ট্রগুলো পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে।”  

    মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রের একপাশে আটলান্টিক ও অন্যপাশে প্রশান্ত মহাসাগরের মত বিশাল জলরাশির অবস্থান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধার রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। একবিংশ শতকের রাজনীতিতে তেমনি দক্ষিণ চীণ সাগরের মত বিশাল জলরাশিকে কেন্দ্র করে চীন পরাশক্তি হিসেবে  উত্ত্থান নিশ্চিত করতে চাইছে।

    বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কৌশলগত সমুদ্রপথ,গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্ট ও প্রণালী, ব্যাপক হাইড্রোকার্বন তথা সমুদ্রসম্পদের উপস্থিতি ও কৌশলগত নানাবিধ কারণে বৃহৎ শক্তি ও আঞ্চলিক শক্তিরাষ্ট্রসমূহের কাছে বঙ্গোপসাগর হল অন্যতম কেন্দ্রস্থল।

    প্রাচীন হিন্দুশাস্ত্রে মহোদধি(বিশাল জলাধার) প্রাচীন মানচিত্রে গ্যাঞ্জেটিকাস সাইনাস (গঙ্গা-উপসাগর), বঙ্গসাগর ও পূর্বসাগর নামে পরিচিত হলেও ভারত-মহাসাগরের উত্তরে ও বাংলাদেশের  ভূখন্ড লাগোয়া এই বিশাল জলাধার আন্তজার্তিক রাজনীতিতে বঙ্গোপসাগর নামেই অধিক পরিচিত। বিশ্বের বৃহত্তম এই উপসাগরের পশ্চিমে ভারত,উত্তরে বাংলাদেশ,পূর্বে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডসহ দক্ষিণে শ্রীলঙ্কাও ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা পর‌্যন্ত বিস্তৃত।

    আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্যা স্ট্রাটেজিস্টের মতে বিশ্বের এক চতুর্থাংশ জনসংখ্যা রয়েছে এই অঞ্চলে।

    অর্থনৈতিক গুরুত্বের কথা চিন্তু করলে দেখা যায় যে, বঙ্গোপসাগর শুধু জলের ঐশ্বর‌্য মন্ডিত এক বিশাল লবনাক্ত জলরাশি নয়,এখানে রয়েছে প্রাকৃতিক,খনিজ সম্পদসহ ব্যাপক হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্যা ডিপ্লোম্যাটের মতে বঙ্গোপসাগরে খনিজসম্পদের সঠিক আহরণ ও ব্যবহার বাংলাদেশকে আগামী দিনের এনার্জী সুপার পাওয়ারে পরিণত করবে।

    মার্কিন জিওলজিক্যাল সার্ভে ডিপার্টমেন্টের তথ্যমতে, অগভীর সমুদ্রে ৮.৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদও সাগেরক্ষেত্রের ১০ ও ১১ নং ব্লকের ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদের কথা প্রাথমিকভাবে জানা যায়। এছাড়াও ১৩ রকমের খনিজ সহ ১.৭৪ মিলিয়ন খনিজ বালুর আনুমানিক ধারণা পাওয়া যায়।

    বঙ্গোপসাগরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাদ-সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড যেখানে তিমি, ডলফিন ও কচ্ছপসহ বিরল জলজ প্রাণীর নিরাপদ প্রজনন কেন্দ্র জীববৈচিত্র্যের অন্যতম আধার। এখানেও খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ আছে বলে ধারণা করা হয়। বিশাল এই জলভান্ডারে রয়েছে মৎস সম্পদের প্রাচুর‌্যতা। প্রতি বছর বাংলাদেশ প্রায় ৬ লক্ষ মেট্রিক টন মাছ  আহরণ করে যা দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ১৮%। বিশ্বের বৃহৎ অখন্ড সমুদ্র সৈকত, ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ও প্রাকৃতিক সৌন্দার‌্যসম্বৃদ্ধ প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত।

    ভূ্অর্থনৈতিক গুরুত্বের দিক থেকে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতির এক বিরাট ভান্ডার। সমুদ্র থেকে অর্জিত আয়কে সমুদ্র অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি বলা হয়ে থাকে। বঙ্গোপসাগরের মজুদ খনিজ সম্পদের কৌশলগত ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ শক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। মৎস্য সম্পদ আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ বৈদেশিক রপ্তানী আয়ে অবদান রাখতে পারে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন ও সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দার‌্যকে কেন্দ্র করে পর‌্যটন শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

    বঙ্গোপসাগরের তলদেশে ৩০ থেকে ৮০ মিটার গভীরতায় একধরণের ক্লের সন্ধান পাওয়া গেছে যা সিমেন্ট উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এভাবে খনিজ,কাঁচামাল ও অন্যান্য প্রাণীজ সম্পদ বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং অর্থনীতির একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়ে এই নীল সমুদ্র।

    বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার,শ্রীলংঙ্কার মত উদীয়মান দেশগুলো বঙ্গোপসার বেসিনে অবস্থিত হওয়ায় এ অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব বিশ্বরাজনীতিতে অপরিমেয়। কলকাতা, হালদিয়া, প্যারাদিপ, বিশাখাপত্তাম,চেন্নাই,পন্ডীচেরী, ধর্মা, চট্টগ্রাম, মংলা, পায়রা ,সিতওয়া,ইয়াঙ্গুন এর মত বন্দর অবস্থান বঙ্গোপসাগরের কৌশলগতকে গুরুত্ব প্রমাণ করে।

    ভূকৌশলগত অবস্থানের কারণে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মত বৃহৎ অর্থনীতি ও শক্তিশালী দেশেগুলো নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষায় বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে আগ্রহ প্রকাশ করে। যেখানে চীনের স্বার্থ হল মহাপরিকল্পনা ‘বেল্ট এন্ড রোড’ উদ্যোগে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করে জনবহুল এই বিশাল পণ্য বাজারে চীনা পণ্যের বাজার সৃষ্টি কার, প্রাকৃতিক জ্বালানী সংগ্রহ করা এবং বঙ্গোপসাগরের মত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে কৌশলগত ও অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের একক আধিপাত্য প্রতিষ্ঠা করা।

    ভারতের স্বার্থ হল বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের ট্রানজিট ব্যবহার করে ভারতের উত্তরপূর্বঞ্চলীয় সাতবোন রাজ্য- আসাম, ত্রিপুরা,মেঘালল, মণিপুর অরুণাচল,মিজোরামে, নাগাল্যান্ডে পণ্য পৌচ্ছে দেয়া ও বঙ্গোপসাগর সহ এশীয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের কৌশলগত আধিপাত্য বিস্তারকে চ্যালেন্স করে ভারতের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। ভারতের ইকোনমিক কটন রুট এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে চীনের সামুদ্রিক সিল্ক রুটকে চ্যালেঞ্জ জানানো।

    জাপাান একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে তার পণ্যের বাজার সৃষ্টিসহ, জ্বালানী সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ রূটকে বৃহৎ শক্তি চীনের নিয়ন্ত্রণ হতে মুক্ত রাখতে চায়।

    অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার একক আধিপাত্যের হুমকী হিসেবে চীনের উত্থানের বিপরীতে ও এই অঞ্চলে চীনের আধিপাত্য যেন শক্তিশালী হতে না পারে এজন্য কৌশলগত পুণ:ভারসাম্য  কৌশল গ্রহণ করে যা বারাক ওবামার পিভটটু এশীয় নীতি থেকেই বোঝা যাই।

    যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তার আধিপাত্য বিস্তারে চীনের বিপরীতে ভারতকে সমর্থন করে। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল তথা দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে ভারতের সাথে সম্মিলিতভাবে ইন্দোপ্যাসিফিক স্ট্রাটেজী বাস্তবায়নে তৎপর মার্কিনযুক্তরাষ্ট্র।

    তবে এটা স্পষ্ট যে, বৃহৎ শক্তিগুলোর এই আপতবিরোধী স্বার্থগুলো অর্জিত হবে বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্ক তৈরী করার মাধ্যমে যে সম্পর্কের কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয় কানেক্টিভিটি। কানেক্টিভিটির নামে বৃহৎ শক্তিগুলো বন্দর,রাস্তা,পাইপলাইন ও রেলযোগাযোগ ক্ষেত্রে অধিক বিনিয়োগে আগ্রহী এই অঞ্চলে।

    বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতে দ্বিপাক্ষীকতা ও বহুপাক্ষিকতার সমন্বয় করতে পারে। দ্বিপাক্ষিকতার ক্ষেত্রে ভারত,জাপান, চীনসহ যুক্তরাষ্ট্রেরর সাথে দ্বিপাক্ষীক সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক তৈরী করে বাণিজ্য বৈষম্য রোধ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে পারে।

    বঙ্গোপসাগরীয় দেশসমূহের জো্ট বিসমটেকে বাংলাদেশের অবস্থান আরো সুদৃঢ় করা উচিত এবং আসিয়ানদেশগুলোতে বাংলাদেশের প্রবেশ বঙ্গোপসাগর দিয়ে  হতে পারে এবং এলক্ষ্যে কূটনৈতিক  তৎপরতা জোরদার করতে হবে।

    বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা তৈরী হয়েছে সেখানে সরাসরি অংশগ্রহণ না করে দ্বিপাক্ষীক ও বহুপাক্ষিক কৌশলগত সম্পর্ক এর মাধ্যমে সমুদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। ফলে ভারত বেষ্টিত ও ভারত নির্ভর রাষ্ট্র নামে প্রথাগত ধারণার পরিবর্তন করে  একটি ক্রমবর্ধমান উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিশালী বাংলাদেশের উন্নয়নের দ্বার উন্মোচন করবে এই বিশাল লবণাক্ত জলরাশি বঙ্গোপসাগর।

    লেখক:

    স্নাতকোত্তর, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

    তথ্যসূত্র :

    Dhaka Tribune- Bangladesh in the Bay

    The Diplomat- Bangladesh: Asia’s New Energy Superpower?

    The Strategist- The Bay of Bengal: the scramble for connectivity

    The Strategist- The Bay of Bengal: the Indo-Pacific’s new zone of competition

    © এই নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
    / month
    placeholder text

    সর্বশেষ

    রাজনীাত

    বিএনপি চেয়ারপারসনের জন্য বিদেশে হাসপাতাল খোজা হচ্ছে

    প্রভাতী সংবাদ ডেস্ক: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্যে আবেদন করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা মনে করেন আবেদনে সরকারের দিক থেকে ইতিবাচক...

    আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ

    আরো পড়ুন

    Leave a reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    spot_imgspot_img