More

    পাঠ প্রতিক্রিয়া: ইন্দুবালা ভাতের হোটেল

    সাংসারিক বেড়াজালে মাস্টারের মারা যাওয়ার পরে ইশ্বররূপে আসে মাছওয়ালি লছমী যার কথায় ইন্দু শুরু করে নতুন জীবন। বাঙালি বেঁচে থাকার খাবার ভাত দিয়েই শুরু করেছিলেন ইন্দুবালা ভাতের হোটেল, যা ইন্দুর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চলমান ছিলো।

    সালমা বীথি:

    শব্দজালের মায়ায় মোড়ানো অভিমান চাপে জীবনের চড়াই উৎরাই পার করা বাঙালি মেয়ে ইন্দুবালা। কলাপোতা গ্রামে বেড়ে ওঠা ইন্দুর বিয়ে হয় কলকাতায় মাস্টার নামেমাত্র পরিচিত রতনলাল মল্লিকের সাথে।

    দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন তারপর মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে ইন্দুর পিতার বরং ভীষণ তাড়া ছিলো বাড়ন্ত মেয়েকে যেকোনো ভাবে শকুনের দল থেকে আড়ালে রাখা। তাই তো বন্ধুর পত্র পাওয়া মাত্র দোজবরের কাছে ওই বাংলায় কন্যাদান করতে একবিন্দু দ্বিমত করেননি।

    কোন এক আষাঢ়ে জন্ম নেওয়া খুলনার কলাপোতার সেই প্রাকৃতিক বিশালতা থেকে দাদীর আদরের ইন্দুর যাত্রা হয় কলকাতার ছেনু মিত্তির লেনের ঘিঞ্জি পরিবেশে যেখানে অন্তত বিয়ের পরের দিনের ও কোন আয়োজন ছিলো না।

    জীবনের প্রথম ট্রেন যাত্রা ছিলো কলকাতার উদ্দেশ্য, চলন্ত ট্রেন হঠাৎ ঝাকুনিতে থেমে যায় কোন এক স্টেশনে। সেই সাথে কান ফাটানো আওয়াজে বোমা আর পুলিশের বন্দুকের আওয়াজ পাওয়া যায়, হাঙ্গামার মধ্যে একদল ছেলেমেয়ে ট্রেনের কামরায় উঠে স্লোগানে গুমোট পরিবেশকে মুখরিত করে। এসব কিছু নতুন ছিলো ইন্দুর জীবনে।

    মিত্তির লেনে আসার আগে দৃশ্যত কাঁটাতারের অপরপাশে রেখে এসেছিলো আজন্ম লালিত ভালোবাসার পরিবার ও মনিরুলকে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানসপটে বেঁচে ছিলো মনিরুল।

    দোজবর মাতাল রতনলালের তিন সন্তানের মাতা ইন্দু কখনো তাদের পিতার পরিবেশে সন্তান পালেন নাই, তাদের মানুষ করতে তাকে কঠিন ও কঠোর হতে হয়েছে, ত্যাগ করে ছিলেন সন্তানদের মায়া। নিজে বাসস্থানের দাদার মতো টোল করে সন্তানদের পড়াতেন একই হাতে সামলাতেন সংসার। যদিও শেষ পর্যন্ত কোন সন্তানই বিপথগামী হয়নি।

    সন্তানদের মানুষ করে তাদের সংসার আলাদা করে দিয়েছিলেন, তবুও বারে বারে সন্তানরা, নাতিনাতনিরা নিতে এলেও ছেনু মিত্তির লেনের বাড়িঘেষা হোটেল ছেড়ে কোথাও যান নি। কখনো বোঝা হতে হয়নি তাকে তার সন্তানদের কাছে।

    সাংসারিক বেড়াজালে মাস্টারের মারা যাওয়ার পরে ইশ্বররূপে আসে মাছওয়ালি লছমী যার কথায় ইন্দু শুরু করে নতুন জীবন। বাঙালি বেঁচে থাকার খাবার ভাত দিয়েই শুরু করেছিলেন ইন্দুবালা ভাতের হোটেল, যা ইন্দুর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চলমান ছিলো।

    এখানে প্রতিটা খাবারে ছিলো ইন্দুবালার যত্নের ছোঁয়া, নিজের হাতে বাজার-সদাই রান্না সবই করতেন। তার সারাক্ষণের সঙ্গী ছিলো ধনঞ্জয়। হরেক রান্নার কোনটাই কখনো এঁটো হয় নি, কখনো কেও খালি মুখে ফেরত যায়নি। সারা সময়ে রান্নার পর্বে পূজার জন্য থাকতো নাড়ু, পিঠে আরও কতোকি। মেসের ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে সব বয়সী লোকের খাবারের আশ্রয় ছিলো এখানে। কিন্তু প্রচারে আর প্রসারে কখনো সায় দেয় নাই ইন্দুবালা।

    ছিলো তার একটি অনুভূতির হিসেব খাতা যাতে তার হাতে লেখা বাজারের হিসাব থেকে মনিরুলের দেওয়া উপহার ও সযত্নে সংরক্ষণ করা ছিলো। বছর বছর খাতায় পাতা বাড়লে কখনো খাতা বদলে যায়নি।

    পড়ন্ত দুপুরে ইন্দুর স্মৃতিতে তার মাটির জন্য আকুলতা, ভালেবাসার মানুষগুলোকে চাওয়ার আকুলতা, না জানা ভালোবাসার স্মৃতি সবকিছু ফিরে আসে, একদিন হয়তো বৃষ্টির ফোঁটায় বর্ডারের কাঁটাতারের দাগ মুছে যাবে বলে তখন আর ভাগাভাগির বাংলা থাকবে না বলে ইন্দুবালার মনে হতো, যদিও কখনো হয়নি।

    লেখক কল্লোল লাহিড়ী ছাপার কালিতে এঁকেছেন সাধারণ এক নারীর জীবনের দৃঢ়তা হার না মানা অভিমান থেকে শতমানুষের অন্নদাতা ইন্দুবালা ভাতের হোটেল যাতে রান্না হতো বাহারি রকম খাবার। জীবনের বাঁকে বাঁকে একে একে সাবাই চলে গেলেও শেষ পর্যন্ত বেঁচে ছিলো ইন্দুর সন্ততুল্য ধনঞ্জয়।

    আন্দোলনের প্রবাহকালে বাঙালি থেকে শ্বাশুড়ির বাঙাল গৃহবধূ থেকে ইন্দুবালা ভাতের হোটেল হয়ে ওঠার গল্পে জড়িয়ে আছে দমবন্ধ করা ইন্দুর জীবনের অজস্র হাহাকার যা তার নিজেরও অজানা ছিলো।

    © এই নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
    / month
    placeholder text

    সর্বশেষ

    রাজনীাত

    বিএনপি চেয়ারপারসনের জন্য বিদেশে হাসপাতাল খোজা হচ্ছে

    প্রভাতী সংবাদ ডেস্ক: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্যে আবেদন করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা মনে করেন আবেদনে সরকারের দিক থেকে ইতিবাচক...

    আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ

    আরো পড়ুন

    Leave a reply

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    spot_imgspot_img