More

    মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, বাংলাদেশের আজন্ম প্রতিপক্ষ, জয় আমাদেরই হবে

    US imperialism, Bangladesh's unborn opponent, victory will be ours

    সাইফুল আলম বাপ্পি:

    ডিসেম্বর ১৯৭১। মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনী ঢাকার চারদিক থেকে ক্রমশ অগ্রসর হয়ে ঢাকা পতনের জন্য শেষ লড়াই চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের মনোবল ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ঠিক সেই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন তার প্রভাবশালী উপদেষ্টা কুখ্যাত হেনরি কিসিঞ্জারের পরামর্শে আটকে পড়া মার্কিন নাগরিকদের উদ্ধার করার নাম দিয়ে জাপানে মার্কিন নৌবাহিনীর সুসজ্জিত ৭ম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে পাঠানোর ঘোষণা দেয়।

    মার্কিনীদের এই ঘোষণার ফলে হঠাৎ করে ইয়াহিয়া খানের মনোবল বেড়ে যায়। যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত ভেবে ইয়াহিয়া খান যখন রাও ফরমান আলীকে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দিবে তখনই মার্কিন ৭ম নৌবহরের বঙ্গোপসাগরে আগমন পাকিস্তানি সামরিক জান্তার মনোবল চাঙ্গা করে তোলে। সাথে মাও সে তুং এর চীনও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির এই চরম ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে নিশ্চুপ থাকে। ফলে পাকিস্তানি জান্তা এবং এদেশের দোসরদের মনোবল আরো চাঙা হয়। কিন্তু সেদিন সোভিয়েত ইউনিয়নের বঙ্গোপসাগরে নৌবহর পাঠানোর ঘোষণা ও ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাহসী হস্তক্ষেপ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কুটচাল ব্যর্থ হয়।

    মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দুনিয়ার বহু দেশে তাদের মোড়লপনার নজির দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই দেখিয়ে আসছে। তাদের পছন্দ না হলেই তারা নৌবহর পাঠানো থেকে শুরু করে স্যাংশনের নামে বানিজ্যিক বাঁধা সৃষ্টি করে। তারা বিভিন্ন দেশে সেখানকার কায়েমি স্বার্থের সুযোগসন্ধানী রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীকে দিয়ে গনতন্ত্র রক্ষা করার অজুহাতে অপতৎপরতা চালায়।

    ১৯৪৮ সালে ইতালির সাধারণ নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার জন্য আটলান্টিক সাগরে ও ভূমধ্য সাগরে নৌবহর পাঠিয়েছিলো আমেরিকা। ১৯৫৩ সালে লেবাননের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার জন্য ৬ষ্ঠ নৌবহর থেকে বৈরুতে সেনা অবতরণযান করায়। দক্ষিণ আমেরিকার দেশে দেশে গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর পতন ঘটানোর জন্য বার বার নৌবহরের সমাবেশ ঘটিয়েছে।

    কিউবা, উত্তর কোরিয়া, ভেনিজুয়েলা, বলিভিয়া, যুগোস্লাভিয়া, ভিয়েতনাম সহ বহু দেশে আমেরিকা অসংখ্যবার বানিজ্যিক নিষেধাজ্ঞাসহ নানা ধরনের স্যাংশন দিয়ে যায়। আরব বসন্তের নামে মিশরকে শেষ করে দেওয়া, লিবিয়া ইরাক আফগানিস্তানকে মৌলবাদীদের অভয়ারণ্যে পরিনত করাসহ দুনিয়ার গনতন্ত্রকামী সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং আত্মনির্ভরশীল জাতিসমূহকে সর্বদা হুমকিতে রাখার কৌশল আমেরিকার চিরাচরিত স্বভাব।

    বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে ধারা, সে ধারা অব্যাহত থাকলে বিশ্বে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থান আরো মজবুত হবে। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম রাষ্ট্র প্রতিবেশী ভারত ইতোমধ্যেই সারাবিশ্বে রাজনৈতিকভাবে বেশ শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। সাম্প্রতিককালে কানাডার সাথে পাল্টাপাল্টি কুটনৈতিক লড়াইয়ে তা প্রমানিত।

    বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য ভারত মহাসাগরের ভূরাজনৈতিক কৌশলের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি চীন তার এশিয়ার রাজনৈতিক নীতির অবস্থানে কোনোক্রমেই ছাড় দিবেনা। বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে চীন যেমন সাথে আছে, ভারতও আছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে রাশিয়ার সরাসরি অংশগ্রহণ বাংলাদেশের কুটনৈতিক ও বানিজ্যিক দক্ষতার প্রমান রাখছে।

    আমেরিকার সেন্ট মার্টিন দ্বীপ নিয়ে আগ্রহী ছিলো কিন্তু বাংলাদেশ তাতে কোনো সায় দেয়নি। শেখ হাসিনা সরকার যখন ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় তখনও আমেরিকা চট্টগ্রাম বন্দর আমেরিকান কোম্পানি এসএসএ কে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দেওয়ার প্রস্তাব রেখেছিলো। সেসময়ও আমেরিকাকে শেখ হাসিনা হতাশ করেন। এবার তারা সেন্ট মার্টিন দ্বীপের ক্ষেত্রেও একইভাবে হতাশ হলো। উপরন্তু রাশিয়ার সহায়তায় রুপপুরে পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করছে বাংলাদেশ।

    রাশিয়া-ইইক্রেন যুদ্ধে আমেরিকার একের পর এক স্যাংশনে জর্জরিত রুশ অর্থনীতি। বাংলাদেশে পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজের ঠিকাদার সংস্থা হল রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা রোসাটম। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রোসাটমসহ কয়েকটি সংস্থার ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

    ওয়াশিংটনের তরফে এই নয়া তালিকায় ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে পাঠানো হয়। তারপরই মার্কিন দূতাবাসের তরফে বাংলাদেশ সরকারকে এই বিষয়ে জানানো হয়। ফলে রোসাটমের সাথে লেনদেনে সাময়িক সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু বাংলাদেশ চীন ও রাশিয়ার মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে ডলারের পরিবর্তে চীনা মূদ্রায় লেনদেন শুরু হয়।

    এই সরকার পদ্মাসেতু বিশ্বব্যাংকের সাথে টক্কর দিয়ে নিজ অর্থায়নে তৈরী করে ফেলা, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে উন্নয়নমূলক প্রকল্পে বিনিয়োগের ব্যবস্থা করাসহ বাংলাদেশের একের পর এক আত্মনির্ভরশীল সিদ্ধান্ত আমেরিকাকে তাতিয়েছে। তাইতো নির্বাচন নাম দিয়ে তারা এসব ভিসা নীতি আর স্যাংশন খেলা শুরু করেছে।

    বাংলাদেশের জনগনের সাথে মার্কিন ভিসা নীতির কোনোই সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশের জনগনের শক্তিতে সেই ১৯৭১ সালেই ৭ম নৌবহর ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিলো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ অনেক শক্তিশালী। কুখ্যাত হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলেছিলো, সেই তলাবিহীন ঝুড়ি এখন আর যথেষ্ট স্বয়ংসম্পূর্ণ জাতি।

    মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ৩০ লাখ শহীদ আর ৩ লাখ মা বোনেদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ আমাদের হৃদয়। কোনো পরাশক্তির চোখ রাঙানি কিংবা তাদের অপ্রয়োজনীয় আবদার মেনে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার সুযোগ পাবেনা। এদেশের আপামর জনতা সকল বাঁধা পার করে এগিয়ে যাবে। সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে সামনের কঠিন চ্যালেন্জ মোকাবিলা করতে বাংলাদেশের জনগন প্রস্তুত আছে।

    আওয়ামিলীগের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে যেভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি শক্তি ও এদেশীয় দালালদের পরাজিত করে বিজয় ছিনিয়ে আনা হয়েছিলো, ঠিক সেভাবেই বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে ২০২৩ সালেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির চোখ রাঙানি তুড়ি মেরে বাংলাদেশের জনগনের বিজয় আসবে।

    লেখক: অনলাইন এক্টিভিস্ট
    ও সহ-সভাপতি, আমাদের কুঁড়েঘর (স্বাধীনতার স্বপক্ষে সামাজিক সংগঠন)

    © এই নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
    / month
    placeholder text

    সর্বশেষ

    রাজনীাত

    বিএনপি চেয়ারপারসনের জন্য বিদেশে হাসপাতাল খোজা হচ্ছে

    প্রভাতী সংবাদ ডেস্ক: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্যে আবেদন করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা মনে করেন আবেদনে সরকারের দিক থেকে ইতিবাচক...

    আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ

    আরো পড়ুন

    spot_imgspot_img